আয়নার পিছনের চরিত্র। লেখকঃ জুবায়ের আহমেদ

" অহনা প্রেম বুঝে ভালোবাসাও বুঝে কিন্তু এগুলোর প্রতি তার কোন আগ্রহ নেই বা প্রেম করার মতো বয়স এখনো হয়নি । মাত্র ক্লাস নাইনে পড়ে সে কিন্তু কিছুদিন যাবৎ একটি ছেলে তার পথ পানে দাঁড়িয়ে থাকে তার চোখই বলে দেয় সে কিছু বলতে চায় । ছেলেটি তার পরিচিত কিন্তু এই ছেলেটির কাছ থেকে সে এই ধরনের আচরণ আশা করে না ।

.

ছেলেটি মসজিদের মোয়াজ্জিন এবং মাদ্রাসার ছাত্র । মোয়াজ্জিন বা মাদ্রাসার ছাত্র হলেই যে তার মাঝে প্রেম থাকবে না বা কামুকতা থাকবে না এটা কিন্তু না,কারন সেও মানুষ তার মাঝে সব ধরনের চাহিদা অবশ্যই আছে । যার কথা বলছি তার নাম ইয়াসিন।

.

একদিন স্কুল শেষে বাসায় ফিরছে অহনা । সময়টা দুপুর তাই রাস্তাটি নির্জন এবং জন মানব শূন্য । হঠাৎ ইয়াসিন অহনার সামনে এসে দাঁড়ায় । অহনা ভরকে যায় এবং ভয়ও পায় কিছুটা । ইয়াসিন কোন ভনিতা না করে সরাসরি প্রপোজ করে বসে । কিন্তু অহনার মুখ দিয়ে কোন কথা বেড় হয় না । বাসায় এসেই মাকে সব বলে দেয় ।

.

আসলে অহনা নিম্ন মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান কিন্তু ইয়াসিন ধরতে গেলে গরিব বলা চলে । মা বাবা নেই মাদ্রাসায় থেকে লেখা পড়া করে এলাকার সবাই তাকে ভালো বলেই জানে কারন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, এবং মসজিদের মোয়াজ্জিন ও । ছেলে হিসেবে খারাপ না । কিন্তু উপরের ভালোর বাইরের ও যে ভেতরে একটা খারাপ আবরণ থাকতে পারে সেটা অনেকের চোখেই ধরা পারে না । তেমনি অহনার মা বাবার চোখেও ধরা পরেনি ।

.

একদিন অহনার মা বাবা ইয়াসিন কে তাদের বাসায় ডাকায় । তারা সরাসরি জিজ্ঞেস করে জানতে চায় সে অহনাকে বিয়ে করতে রাজি আছে কিনা । প্রথমে সামান্য ইতস্তত বোধ করলেও পরে এই শর্তে রাজি হয়, বিয়ে করবে ঠিক আছে কিন্তু আপাতত অহনা এখানেই থাকবে যে পর্যন্ত না সে পড়া লেখা শেষ করে ভালো কোন চাকরি পায় কারন এখন তার পক্ষে সংসার সাজানো সম্ভব নয় আবার অহনাও মাত্র নাইনে পড়ছে।

অহনার মা ভেবে দেখে ছেলে ভালো, কোন ঝায় ঝামেলা নেই । এই ছেলের সাথে তার মেয়েকে বিয়ে দিতে পারলে অহনা সুখীই হবে হয়তো ।

.

কথা অনুযায়ী ইয়াসিনের সাথে বিয়ে হয় অহনার । অহনা কোন আপত্তি করেনি। বাবা মায়ের সিদ্ধান্তই তার সিদ্ধান্ত কিন্তু অহনার চার ভাই কিছুটা আপত্তি করেছিল কিন্তু রাগী বাবার কাছে সেই আপত্তি টিকেনি।

.

বিয়ে হওয়ার পর অহনা তাদের বাড়িতেই থেকে যায় । ইয়াসিন তাকে স্কুলের পরিবর্তে এক ক্লাস নামিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দেয় । ইয়াসিন মাঝে মাঝে অহনাদের বাড়িতে আসে এবং রাত্রি যাপন করে । ভালোই চলছিল তাদের দিন কাল কিন্তু অহনার মেজ ভাবি রূপা ইয়াসিনের চরিত্র ধরে ফেলে । ইয়াসিন যে মোটেও ভালো চরিত্রের মানুষ নয় তা অনেকটা টের পেয়ে যায় । কিভাবে যেন তাকায় তার দিকে । তার দৃষ্টি যেন সবসময় তার বক্ষদেশে পরে থাকে ।

.

একদিন অহনার ভাবি রূপা গোসল করতে ছিল । খোলা বাড়ির গোসল খানা । চারপাশে বেড়া দিয়ে ঢাকা তারপরও ছিদ্র দিয়ে তাকালে ভেতরের সমস্ত কিছুই দেখা যায় । হঠাৎ কিসের যেন শব্দ হলো তিনি সচেতন হয়ে গেলেন । কে ওখানে ? বলতেই কারো পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল । তিনি ছিদ্র দিয়ে দেখতে পেলেন অহনার বর দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে । তারপরেও কাউকে কিছু বললেন না কিন্তু আরেকটি ঘটনার পর অহনাকে না বলে থাকতে পারলেন না তিনি ।

.

রূপা তার রুমে একা শুয়ে আছে কারন তার স্বামী প্রবাসী । হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো । কে দরজায়, জিজ্ঞেস করতেই উত্তর আসলো ভাবি আমি ইয়াসিন খুব জরুরী দরকার একটু দরজাটা খুলুন । রূপা বিষয়টা হয়তো তেমন মাইন্ডে নিল না । তিনি ভাবলেন হয়তো আসলেই জরুরি কিছু । দরজা খুলে দিতেই ইয়াসিন ঘরে ঢুকেই আবার দরজা লাগিয়ে দিল । রূপা অনেকটা বিস্মিত হয়ে যায়, দরজা লাগানো মানে কি ! ইয়াসিন ঘুরে তাকায় তার দিকে , তার চোখে অন্য রকম মাদকতা ।

.

-- ভাবি ভয়ের কিছু নেই । আপনি কতদিন ধরে একা একা থাকেন । আপনাকে দেখে আমার খুব মায়া হয় । এই ভরা যৌবন সময়ের স্রোতে কিভাবেই না বৃথা যাচ্ছে । আপনি চাইলে আমি আপনাকে পূর্ণ তৃপ্তি দিতে পারবো কেউ কিচ্ছু জানবে না, এমনকি অহনা ও না । ভয় নেই অহনা ক্লান্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে, টের পাবে না কিছু ।

.

ইয়াসিনের কথা শুনে রূপার এতোটাই না মন মেজাজ খারাপ হয়েছে যে মনে চাচ্ছে জোতা দিয়ে কয়েকটা বারি দেয় তার গালে ।

.

-- আপনি এক্ষুনি এখান থেকে বেড়িয়ে যান আর তা না হলে আমি চিৎকার দিয়ে মানুষ জড়ো করতে বাধ্য হবো ।

.

ইয়াসিন সুবিধা করতে পারেনা, দ্রুত রূপার ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে ।

.

এবার কোন ছাড় দেয় না সকাল হতেই অহনার কাছে গত রাতের ঘটনা সব বলে দেয় রূপা । ঘটনা শুনে অহনার চিৎকার দিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে কিন্তু কাউকেই কিছু বলতে পারছে কারন সে এখন অন্তঃসত্ত্বা । সংসার ভেঙ্গে দেওয়াও তার পক্ষে অসম্ভব । তার পরেও স্বামীর সাথে সে লড়াই করে বাধ্য করে আলাদা বাসা নেওয়ার ।

.

এতদিনে অবশ্য ইয়াসিনের একটা চাকরি হয়েছে আর অহনার কোল জুড়ে এসেছে ফুটফুটে একটি সন্তান । তবে সামান্য চাকরির টাকায় তাদের সংসার তেমন চলে না, তাই ইয়াসিন সন্ধ্যার পর একটি মেয়েকে তার নিজ বাসায় পড়ায় । যদিও অহনার আপত্তি আছে এতে, তবুও অহনা তার স্বামীকে চোখে চোখে রাখে কারন সে জানে তার স্বামীর চরিত্র ।

.

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য অহনা মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে তার স্বামী অন্য মেয়েদের সাথে রঙ লীলায় মক্ত । এমনকি গণিকালয়েও পর্যন্ত সে গমন করে কিন্তু অহনা ভেবে পায় না মুখে দাড়ি রেখে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে তার পক্ষে এগুলো কিভাবে সম্ভব । তারপরেও নিজেকে সান্ত্বনা দেয় ভুল সব ভুল কিন্তু তবুও স্বামীকে জিজ্ঞেস করে কিন্তু এই সব শুনে ইয়াসিন প্রচণ্ড রেগে যায় । কিন্তু মন থেকে অহনার সন্দেহ দূর হয় না ।

.

একদিন সকালে অহনার মোবাইলে তার মামির মৃত্যুর সংবাদ আসে । কোন কিছু না ভেবেই অহনা চলে আসে তার মামার বাড়ি এবং সে তার স্বামীকে ফোন করে জানায় সে হয়তো দুই তিন দিন সেখানে থাকে যেতে পারে । খাওয়া দাওয়াত যেন বাহির থেকে করে নেয় । কিন্তু বিকেল হতেই অহনার মন ছটফট করতে থাকে কারন সে জানে সন্ধ্যা পর তার স্বামীর ছাত্রী বাসায় পড়তে আসবে সেখানে না আবার কিছু করে বসে সে ।

.

সবার অনুরোধ উপেক্ষা করে অহনা আবার বাসার পথে রওনা দেয় । কিন্তু স্বামী কে কিছুই জানায় না । বাসায় এসে দেখে দরজা ভেতর থেকে লাগানো । তার মন অজানা শঙ্কায় উতাল হয়ে উঠে । কয়েকবার দরজা ধাক্কা দিলেও ইয়াসিন দরজা খোলে না । ধাম ধাম বারি দিতে থাকে দরজায় কিন্তু ভেতর থেকে কোন সারা শব্দ নেই । এক সময় দরজা খোলে ইয়াসিন । অহনা যা বোঝার বুঝে যায় । মেয়েটি অপ্রস্তুত কাপড় এখনো ভালোভাবে পরা হয়নি । ইয়াসিনের চেহারায় অপরাধীর ভাব স্পষ্ট ।

.

অহনার আকাশ ভেঙে পরে । তার সাজানো সংসারে ভূমিকম্প শুরু হয় । মেয়েটিকে সে কিছুই বলে না । মাথা নিচু করে সে বেড়িয়ে যায় । অহনার প্রচণ্ড ভাবে মনে চায় ইয়াসিনের দড়ি টেনে ধরে তাকে জিজ্ঞেস করতে, এই সুন্নতি দাড়ি রাখা কিসের জন্য । ঘরে সুন্দরী বউ রেখে অসুন্দর একটি মেয়ের সাথে ফষ্টি নষ্টি কিসের জন্য । তোর কি লজ্জা করেনা এই অপবিত্র শরীর নিয়ে মসজিদে নামাজ পড়তে । লজ্জা করে না তোর ইসলামের বাহক হয়েও অসামাজিক কার্যকলাপে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে ।

.

কিন্তু না, অহনা কিছুই বলে না, তার ছেলে রাফিকে নিয়ে সে বাসা থেকে এক কাপড়ে বাবার বেড়ি চলে আসে । সে সিদ্ধান্ত নেয় এই ভন্ড হুজুরের সাথে সে আর সংসার করবে না । সমস্ত ঘটনা বলে দেয় তার মা বাবা এবং ভাইদের কাছে । ভাইয়েরা ঘটনা শোনার পর তাদের রক্ত আগুন হয়ে যায় । তারা কিছুতেই এই বদমাশ লোকের সাথে বোনের সংসার আর করতে দিবেনা । কিন্তু অহনার মা বাবা জিনিসটা অন্য ভাবে নেয় । অহনার একটি সন্তান আছে অন্যথায় বিয়ে দিতেও অনেক সমস্যা । আর পুরুষ মানুষ ভুল করতেই পারে । যদি ইয়াসিন নিজের অন্যায় স্বীকার করে পরিবারের সদস্যদের সামনে ক্ষমা চাইতে পারে তবেই তারা ইয়াসিনের হাতে তাদের মেয়েকে তুলে দিবে ।

.

অহনার মা বাবা ইয়াসিনের এক দূর সম্পর্কের দাদি কে খবর পাঠায় এবং বলে দেয় তাদের সিদ্ধান্তের কথা । সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইয়াসিন নিজের ভুলের জন্য সবার কাছে ক্ষমা চায় । এমনকি অহনার কাছে ক্ষমা চাওয়া পর্যন্ত বাদ যায় না ।

.

মা বাবার কথা নিজের অসহায়ত্ব এবং স্বামীর ক্ষমা চাওয়া জন্যে অহনা তার সিদ্ধান্ত থেকে ফেরত আসে । সে আবার ফিরে আসে স্বামীর সংসারে । মন থেকে মেনে নিতে না পারলেও তার কিছুই করার নেই কারন সে তো মেয়ে, মেয়েদের অনেক কিছু মেনে নিতে হয় কিন্তু একই কাজ যদি সে করতো তবে কি তার স্বামী তাকে মেনে নিত ? অবশ্যই না । কারন পুরুষ শাসিত সমাজে পুরুষের দোষ গুলোকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় কিন্তু মেয়েদের দোষ গুলোর পরিবর্তে তাদের প্রতি নেওয়া হয় চরম ভাবে প্রতিশোধ ।

.

সংসার চলছে সংসারের গতিতে কিন্তু যে বিশ্বাস একবার ভেঙে যায় সে বিশ্বাস আর কখনোই ফিরে আসে না তবুও রাফির কোমল চেহারার দিকে তাকিয়ে সুখের অভিনয় করতে হয় প্রতিনিয়ত এছাড়া যে অহনার তার কোন গতি নেই । এ যেনো স্বামীর আয়নার আড়ালের চরিত্র।

.

গল্পঃ- আয়নার পিছনের চরিত্র।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts