আয়রণ বা রক্তে লৌহ সল্পতা

“আয়রন বা রক্তে লৌহ-স্বল্পতা”ঃ


এ রোগে নারী ও শিশুরা বেশি ভুগে থাকেন। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মেয়েদের এটি একটি প্রধান সমস্যা। বাংলাদেশে শতকরা প্রায় ৪২ ভাগ মেয়ে বা নারী আয়রন বা রক্তে লৌহ-স্বল্পতায় ভুগছেন। অর্থাৎ প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে ৪ জন অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতার শিকার।                                                                      মানবদেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে রক্ত অন্যতম। আর হিমোগ্লোবিন রক্তের একটি অন্যতম প্রধান উপাদান। এই হিমোগ্লোবিনের কাজ হল শরীরের অক্সিজেন সরবরাহকে নিশ্চিত করা। শরীরে আয়রনের কমতি হলে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ কমে যায়। আর হিমোগ্লোবিন কম হওয়া মানেই হল শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটা। রক্তস্বল্পতার কারণে নানা রকম অসুখ বাসা বাঁধতে পারে আমাদের শরীরে !


সাধারণ ভাবে এক জন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের শরীরে দৈনিক ১৪ থেকে ১৮ গ্রাম আর মহিলার শরীরে দৈনিক ১২ থেকে ১৬ গ্রাম হিমোগ্লোবিন দরকার পরে।


হিমোগ্লোবিনের ঘাটতিতেই দেখা যায় -                                        শরীর ও চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া,দুর্বলতা,বুক ধড়ফড় করা,সামান্য পরিশ্রমে হাপিয়ে যাওয়া ও ব্যয়ামের পর শ্বাসকষ্ট হওয়া,কানে ঝিঁঝিঁ শব্দ শোনা,খাবারে অরুচি ও ক্ষুধামন্দা,নখ ভঙ্গুর হওয়া বা নখের আকৃতি চামচের মত হওয়া,কাজকর্ম পড়ালেখায় অমনোযোগী হওয়া।

আয়রন স্বল্পতা হলে দ্রুত চুল পড়ে যাওয়া, ওজন কমে যাওয়া ,হতাশায় ভোগা, দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি অনুভব, চুলের রং লালচে হয়ে যাওয়া কিংবা শুষ্ক হয়ে যায়।


আসুন জেনে নিই কী কী খাবারে রক্ত স্বল্পতা রোগ সেরে যাবে/প্রতিরোধ করা যাবে-


আয়রন যুক্ত খাবার –                                                           মাছ সব চাইতে ভালো আয়রনের উৎস বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ। শিং মাছ, ইলিশ মাছ, ভেটকি মাছ, টেংরা মাছ ইত্যাদি সব মাছেই রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন। প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সর্বনিম্ন ৬০ গ্রাম মাছ রাখুন রক্তস্বল্পতা রোগ থেকে দেহকে মুক্ত রাখে। 

এছাড়া কচু শাক, কচুর লতি, কচু, পালং শাক, বিট, লেটুস, ব্রকোলি, ধনিয়া পাতা এবং পুদিনা পাতা, চিকেন লিভার, ডিম, পেঁয়াজ, কুমড়োর বীজ, ডালিম, আমলকি, মধু, গুড়, অমন্ড, আখরোট ইত্যাদি খেতে হবে। বিশেষ করে বিটের জুস রক্তশূন্যতায় অত্যন্ত উপকারী। এটি অল্প সময়ের মধ্যে রক্তস্বল্পতা দূর করে দেয়। শরীরে লোহিত রক্তকণিকা বৃদ্ধি করে এবং দেহে অক্সিজেন সরবারহ করতে সাহায্য করে।


তবে উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন পেতে হলে শাক-সবজির সঙ্গে ভিটামিন সি’জাতীয় খাবারও খেতে হবে।

ভিটামিন সি যুক্ত খাবার –

খাবারের আয়রনকে পুরোপুরি ব্যবহার করার জন্য ভিটামিন সি’জাতীয় খাবার যেমন- পেয়ারা, আমলকি, বাতাবিলেবু, কমলা ,আঙুর, টমেটো স্ট্রবেরি, মরিচ ইত্যাদি খেতে হবে। কারণ ভিটামিন সি’জাতীয় খাবার উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রনকে খুব ভালোভাবে শরীরে শোষণ করতে সাহায্য করে।


ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার –


ফলিক অ্যাসিডের অভাব ক্রমশ হিমোগ্লোবিনের অভাব সৃষ্টি করে। তাই ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। সবুজ শাকপাতা, মটরশুঁটি, গম, কলা, বাদাম, ব্রকোলি, চিকেন লিভার ইত্যাদি ।

প্রতিদিন খাওয়া উচিত যেসব খাবারঃ-


আপেল: প্রতিদিন একটা করে আপেল খাওয়া উচিত। আপেলে আয়রন ছাড়াও হিমোগ্লোবিন উৎপাদনকারী অনেকগুলি উপাদান আছে। আপেলের সরবতও করে খাওয়া যেতে পারে।


ডিম : আর ডিম প্রোটিনে ভরপুর এ খাদ্যটি দেহে পুষ্টি যোগায়। অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি প্রতিদিন একটি ডিম খেলে রক্তস্বল্পতা দ্রুত দূর হবে


দুধ: প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও প্রোটিন যোগায়। দুধে খুব বেশি পরিমাণে আয়রন না থাকলেও এতে প্রায় সব রকমের ভিটামিন বি আছে। এছাড়াও দুধে আছে পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম। এই খাদ্য উপাদান গুলো রক্তের হিমোগ্লোবিন বাড়িয়ে রক্ত শূন্যতা দূর করতে সহায়তা করে। তাই রক্ত শূন্যতা রোগীদের জন্য রাতে নিয়মিত অন্তত এক গ্লাস করে দুধ খাওয়া উপকারী।


 বিশেষ সতর্কতা :


 আয়রন নষ্ট করে এমন খবার খাবেন না। চা, কফি, কোলা জাতীয় পানীয় আয়রন নষ্ট করে। তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।


শরীরে আয়রনের ঘাটতি যদি খুব মারাত্মক আকার ধারণ করে তবে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেয়া উচিত।কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু খাবার ও পথ্য দিয়ে রক্তস্বল্পতার চিকিৎসা সম্পূর্ণ হয় না। পথ্যের পাশাপাশি আয়রন, ফলিক এসিড ট্যাবলেট দিয়ে থাকেন চিকিৎসক। ক্ষেত্র বিশেষে তীব্র রক্তস্বল্পতায় রোগীকে রক্ত দেওয়া হয়ে থাকে। তাই অন্য সব অসুখের মতোই রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রেও প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই উওম !

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts