উন্নয়নের বিশ্ব স্বীকৃতিতে বাংলাদেশ


ভঙ্গুর এক অর্থনৈতিক দশা থেকে একাত্তরে যাত্রা শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ। দেশটির অর্থনীতি পরাস্ত হয় বিদেশী সাহায্য ও ঋণ নির্ভরতায়। পাকিস্তানীদের শোষণে রুগ্ণ দেশকে বাঁচাতে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় সব। মুক্ত, কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বদেশে বৈষম্যহীন, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পথ চলা শুরু। দারিদ্র্য জয় করে দীর্ঘ ৪৭ বছরে সেই নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান মতো, ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় গত অর্থবছরে ৩ হাজার ৬শ’ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। শুধু রপ্তানি নয়, দেশের বাজেটের আকার, জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সরকারী-বেসরকারী বিনিয়োগ, রাজস্ব আয়, রেমিটেন্স আহরণ, দারিদ্র্যনিরসন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো তৈরি ও উন্নয়ন, বিদ্যুত উৎপাদন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে সফলতা। বাংলাদেশের অর্থনীতির এমন অর্জনকে বিস্ময়কর বলেছেন পৃথিবী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশের এ উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে এসেছে বিশ্ব স্বীকৃতিও।


জানা গেছে, স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় চরম দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ মারা যায়। আর স্বাধীনতার পর গত চার দশকে বিদেশী রাষ্ট্রের শোষণমুক্ত বাংলাদেশ বেশ পুষ্ট হয়েছে। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বহু পথ এগিয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প কোন প্রকার বৈদেশিক সহায়তা ছাড়াই নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ। ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) এক অনুষ্ঠানে এসে বাংলাদেশের গৌরবময় অর্জনের কথা শুনিয়ে যান নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অগ্রগতির ওপর আলোকপাত করে তিনি বলেন, যারা এক সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিল তারা আজ এ দেশকে ‘উন্নয়নের মডেল’ মনে করছে। স্বাধীনতার পর গত ৪৭ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতির এ অর্জনকে ‘রোল মডেল’ মনে করছে বিশ্বের অনেক বড় বড় দেশ। অনেক ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে। দারিদ্র্যবিমোচন, নারী শিক্ষা, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার কমানো, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার মতো বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি নজর কেড়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়ের।


মূলত ১৯৭১ সালে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে পাকিস্তানী শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল বাঙালী জাতি। স্বাধীনতার চার দশক পর সে স্বপ্ন অর্জনের পথে অনেকটাই এগিয়েছে দেশ। আর এ স্বপ্ন পূরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে রপ্তানি খাত। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ের রপ্তানি খাত কাঁচা চামড়া ও পাট নির্ভর হলেও সময়ের আবর্তনে সে তালিকায় যুক্ত হয়েছে তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণসহ হাল্কা ও মাঝারি শিল্পের নানা পণ্য। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের মাত্র ৩৪ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় গত অর্থবছরে পৌঁছেছে প্রায় ৩ হাজার ৬শ’ কোটি ডলারে। অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ মনে করেন, মাথাপিছু কম জমি নিয়ে আর কোন দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এমন ইতিহাস করেনি। আমাদের বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে ক্রমাগতভাবে বেশি করে সংযুক্ত হতে হবে। যে শিল্প পণ্যগুলো বহুমুখী করে রফতানি করব, সেগুলোর কাঁচামাল এবং মধ্যবর্তী পণ্য আমাদের আমদানি করতে হবে, এটাই এখন চ্যালেঞ্জ।


অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমাদের অর্জন অনেক। কিন্তু এই অর্জন আরও হতে পারত। নানা কারণে তা হয়নি। বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ বেড়েছে। পোশাক রপ্তানি করে এখন আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে। আমাদের কোম্পানিগুলোর নাম এখন বিশ্বের বড় বড় দেশগুলোতে পৌঁছে গেছে। এগুলোর সবই আমাদের অর্জন।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts