ঐতিহ্যবাহী লেবানন

আমার ভ্রমণ করার সখ অনেক। অজানাকে জানার- নতুন নতুন জায়গা কাছ থেকে দেখার। হঠাৎ একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম লেবানন ভ্রমণে যাবো। আমার এক দূরসম্পর্কের বড় ভাই দীর্ঘদিন যাবত থাকেন লেবাননে। নাম আব্দুল মান্নান। আমি উনাকে মান্নান ভাই বলে ডাকি। আমাকে রিসিভ করতে এয়ারপোর্টে আসেন মান্নান ভাই। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে রওনা দিলাম মান্নান ভাইয়ের সাথে। উনি থাকেন তারাবোলুছ, এটি লেবাননের একটি শহর। তিনি দীর্ঘদিন যাবত সেখানকার একটি প্লাস্টিকের ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন। মান্নান ভাই সহ পাঁচ জন বাঙালি কাজ করেন সেখানে । আল-মামুন, ইমন, রকিবুল ইসলাম ও আসাদুল ইসলাম। সেখানে যাবার পর সবার সাথে পরিচিত হলাম। জানতে পারলাম ওনাদের প্রতি মাসের বেতন ৪০০ ডলার বাংলাদেশের প্রায় ৩৩হাজার টাকা থাকা মালিকের এবং খানা ও পকেট হরজ সহ যাবতীয় নিজেদের এবং প্রতি বছর বছর নিজ খরচে আকামা করতে হয়। ২ হাজার ডলার বাংলাদেশের প্রায় ১লক্ষ ৭০ হাজার টাকা। আরও জানতে পারলাম এখানে বাংলাদেশী মেয়েরা বাংলাদেশী ছেলেদের সাথে কনট্রাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। যতদিন এই দেশে থাকবে ততদিনই স্বামী স্ত্রী। এবং প্রতিনিয়ত অসংখ্য বাঙালি মেয়েরা দেহ ব্যাবসায় লিপ্ত হয়। পরেরদিন মান্নান ভাইকে সাথে নিয়ে ঘুরতে বের হলাম বরফ ঢাকা পাহাড়ময় অপরূপ লেবানন পরিদর্শনে। যত দেখছি দৃষ্টি যেন আটকে যাচ্ছে স্মৃতির ফ্রেমে...


উত্তরে সিরিয়া,দক্ষিণে প্যালেস্টাইন,মেডেটিরিয়ান সাগরের পাড়ে হাজারো বছরের ঐতিহ্য সংস্কৃতি নিয়ে অবস্থান করছে পাহাড়ময় লেবানন। তাদের সংস্কৃতি আরব্যদের মতোই। তারা আরবি ভাষায় কথা বলে, স্বাধীন চেতনায় তারা গনতান্ত্রিক। এদেশে খ্রিস্টান ও মুসলিমদের বসবাস। এখানকার লেবানন আর আগের মতো নেই নতুন রূপে রূপান্তরিত হয়েছে এই দেশ। নারী পুরুষের কোনোরকম ভেদাভেদ নেই। পোশাক-আশাক দেখলে বুঝাই যাইনা কে মুসলিম কে খ্রিস্টান। নামে কেবল মুসলিম চালচলন পুরোটাই খ্রিস্টানদের মতো। প্রাচীনকালে নবী রাসূলদের পথচারনা ছিল এই লেবাননে। উঁচু উঁচু পাহাড়, সেই পাহাড়ের উপরে বিশাল- বিশাল অট্টালিকা- সেই অট্টালিকায় জনবসতি। পাহাড়ের উপর দিয়েই বয়ে চলছে আঁকাবাঁকা, উঁচু-ঢালু পিচঢালা মেঠোপথ। 
শীতের আর এক নাম লেবানন। শীতকালে প্রচন্ড শীত- হাড় কাঁপানো শীত। অবিরাম বৃষ্টিপাত সেই সাথে শিলাবৃষ্টি,বরফ ঢাকা পাহাড়। আর গরমকালে সবসময় গরমের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। এখনকার লেবানানর আয়তন ১০ বর্গ কিঃ মিঃ, জল ভাগ ১.৬, জনসংখ্যা প্রায় ৫ লাখ। লেবাননের রাজধানীর নাম বৈরুত। লেবাননে চলে ডলার, নতুবা লিরা। লেবনিজ পাউন্ড হল তাদের জাতীয় মুদ্রা। প্রধান আয়ের খাত পর্যটন, কৃষি। তারা স্বাধীনতার স্বীকৃতি পেয়েছিল ২২ নভেম্বর ১৯৪৩ সালে। লেবানানের রূপকার হলেন রাফিক বা আল দিন হারিরী। 

তিনি লেবনিজ সৌদি ধনী ব্যাবসায়ী। তিনিই এক মাত্র ব্যক্তি এই পর্যন্ত যিনি নেতৃত্বে দিয়েছেন লম্বা সময়। তিনি একজন সুন্নি সৎ মুসলিম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ২০০৫ সালে ইসরায়েলি চক্রান্তে বোমা মেরে হত্যা করা হয়েছিল এই বীর পুরুষ রাফিক হারিরী সাহেবকে। লেবাননের বর্তমান প্রেসিডেন্ট রাফিক হারিরির সাহেবের সুযোগ্য সন্তান সাদ হারিরী। স্বাধীনতার পর দীর্ঘসময় কালীন লেবাননের আকাশে উড়ছিল সুখের পায়রা। হঠাৎ জরজ ইসরায়েলের চক্রান্তে একের পর এক শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে ইসরায়েল হামলা চালালে হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধ শুরু হয়। তারপর দেশটি বিরাট অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে যায়। ইসরায়েলের চক্রান্তের শিকার এখনও পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলো পরাধীন। প্যালেস্টাইনের অসহায় মুসলিমদের উপর একের পর এক নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এখনও সিরিয়ায় প্রতিদিন চলছে গৃহযুদ্ধ। বর্তমানে সিরিয়ার অসংখ্য মানুষ জীবন রক্ষার্থে অবস্থান করছে লেবানন। দেখতে দেখতে সময় ফুরিয়ে এলো... এবার বিদায়ের পালা। চলে যেতে নাহি চাই তবুও চলে যেতে হয়, শত কষ্টের মাঝেও বিদায় নিতে হয়। বিদায় নামক বাক্যটি যেন বারবার বেদনার ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ে ভাঙছে হৃদয় কূল। মান্নান ভাই সহ সকলেকে হাত উড়িয়ে বিদায় বার্তা জানিয়ে- নাড়ির টানে রওনা দিলাম বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts