কিশোর উপন্যাস পর্ব- ৩ ও ৪ ** কাজল সখা **

কিশোর উপন্যাস পর্ব ৩ ** কাজল সখা **

দ্বিতীয় পর্বের পর-....


সখা চা রেস্টুরেন্টের চেয়ারে অচেতন হয়ে যাওয়ার পর লোকজন জমে গেলো। নানান জনে নানান কথা, কেউ কেউ সমবেদনা কেউ বা আবার উপহাস করছে। ভিড়ের মধ্যে একটা লোক সবাইকে  ভিড় ঠেলে সখার কাছে গেল। হাত দিয়ে দেখল গায়ে প্রচন্ড জ্বর ও অচেতন। শিরাগুলো এখনো টিক টিক করে ঘড়ির কাটার মতো বাজছে। দাড়িয়ে বলল আপনারা এখানে দাড়িয়ে কি দেখছেন। একটা ছেলে এখানে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। কোথায় ছেলেটাকে একটু সাহায্য করবেন না হয় হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। তা না মনে হয় সার্কাস দেখছেন। ভিড়ের ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল যান যান আপনি যাননা এত মায়া থাকলে। কে বা কারা চিনা নেই জানা নেই। ধরলে আবার কোন বিপদ এসে ঘাড়ের ওপর চেপে বসে।  


ভদ্রলোকটি একটি গ্লাস থেকে পানি নিয়ে মুখে ছিটিয়ে দিতেই সখা কেঁপে উঠলো। চোখ খুলতে চেয়েও যেন খুলতে পারলো না।  আবার একই অবস্থা অচেতন হয়ে পড়ে। তাই আর দেরি করা ভালো হবেনা ভেবে আরো দু একজনের সহযোগিতা নিয়ে হাসপাতালে নিয়ে এলো। ডাক্তার আশস্ত করলেন স্যার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শরীরে অনেক বেশি জ্বর আর দূর্বলতার ক্লান্তির জন্য এই অবস্থা হয়েছে। ভদ্রলোকের মুঠোফোন বেজে উঠল রিংটোন। কল গ্রহণ করতে ই অপর পক্ষ থেকে ভদ্রলোকের বন্ধু আসিফ সাহেব বলল তোমার সাথে জরুরি একটা কাজ ছিল দেখা করতে চাই কোথায় আছ।

ভদ্রলোক বলল আমি একটা ছেলেকে নিয়ে আমার বাসার পাশে মুক্তি হসপিটালে আছি জরুরী বিভাগে। এখানে আসতে পারো অপর পাশে থেকে ছেলেটেলে আবার কে? আরে বলোনা এখনো চিনাজানা হয়নি। আসিফ সাহেব বিরক্তি ভাব নিয়ে চিনাজানা নেই এটা আবার কেমন কথা আবার হাসপাতালে। ব্যপারটা কি? 

জনদরদী হয়ে গেলে নাকি। তাহলেতো ভালোই হলো আগামীতে....  ভদ্রলোক আচ্ছা আচ্ছা রাখো ডাক্তার কি যেন বলতে চাচ্ছে, তুমি আসো পরে সব জানা যাবে.. এই বলে কলটি কেটে দিল..

আসিফ সাহেব উনার স্ত্রীর সাথে মজা করে বলছে এই আমি একটু হাসপাতাল থেকে আসছি। আমার বন্ধু নাকি ইদানীং জনসেবক হয়ে গেছে দেখে আসি। স্ত্রী সাথে সাথে এই সন্ধ্যা বেলা এখন আবার হসপিটালে কেন ? আরে বলোনা যত প্যাচাল তকি ভাই কোথাকার চেনা নেই জানা নেই।  এক ছেলেকে নিয়ে নাকি হাসপাতালে গেছে। আমি ফোন দিয়েছিলাম বলল আমাকেও যেতে। স্ত্রী যাও যাও খেয়েদেয়ে আর কোন কাজ নেই জনসেবা কর গিয়ে।  


ভদ্রলোক তকি সাহেব এগিয়ে গেল সখার নিকট। দেখতে পেল সখা হাসপাতালে সিটের উপর বসা। সখা ভয়ে বুকটা কেঁপে ওঠে। আমি এখানে কেন?  কি হলো আমার, মুহূর্তেই মনে পড়ে অচেতন হওয়ার আগের কথা। একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসেছিল।  তারপর তারপর কি হলো আর কিছুই মনে নেই। ভদ্রলোক জানতে চাইল এখন কেমন লাগছে তোমার। সখা ভয়ে ভয়ে অস্পষ্টভাবে উত্তর দিল জ্বি ভালো। 

ভদ্রলোক হাসি মুখে বলল তোমার এ অবস্থা কেন? কি নাম তোমার কোথায় থাক? সখা বলতে যাবে ঠিক এই মুহূর্তে প্রবেশ আসিফ সাহেব। আসিফ সাহেব চমকে গেলেন ব্যপার কি এ দেখি আমাদের সখা। সে এখানে এলো কি করে। মনে পড়ে সকালে ফোন দিয়েছিল ফরিদা আপু সখাকে পাওয়া যাচ্ছে না বলেছিল, হে মাওলা তোমার খেলা কে বুঝে! আসিফ সাহেব কে দেখে সখাও চমকে উঠে। মনে মনে ভাবে এভার ঠিক স্থানে ধরা খেলাম তাহলে। ভদ্রলোক জিগ্যেস করে কি আসিফ তুমি ওকে চিন না কি?  চিনবনা মানে ও আমার ভাইরার ছেলে। আমার স্ত্রীর আপন বড় বোনের ছেলে। 

তারপর সব কথা খুলে বলল। সখাকে পরের দিন বাসায় নিয়ে এলো সখার বড় ভাই ও মা বাবা এলো ঢাকায়। সখা কে নিয়ে বাড়ি চলে এলো। সখাকে আবার নতুন করে দেখতে আসেপাশের সবাই এলো সখাকে নাকি জ্বিনে নিয়ে গেছে। ভাগ্যো ভালো হুজুরের নিকট গিয়েছিল সখার বাবা। তা না হলে কি যে কি হত সে কথা কি আর ভেবে শেষ করা যায়। দুধ দিয়ে গোসল করিয়ে ঘরে আনা হল। সখাকে দেখতে কাজল ও এসেছে আরো বান্ধবীদের নিয়ে।


এই কটা দিন কাজল কি যে অস্থির রতায় ভোগছিল তা বান্ধবীদের কথা থেকেই টের পাওয়া যায়। এই সখার জন্য নামাজ পড়ে দোয়া করেছে। সখার যেন কোন ক্ষতি না হয়। চিন্তায় চিন্তায় কাজল ও যেন দুদিনে শুকিয়ে গেছে। পড়া লেখায় তো মন একদম দিতেই পারেনি। কাজলের বাবা মা ব্যপারটি চোখে পড়ে কাজলের অমনোযোগী অস্থিরতা। যাইহো কাজলের সখা কাজলের সামনে এখন। এর চেয়ে বড় সুখ আর কি হতে পারে।  আল্লাহ কাজলের দোয়া ইচ্ছে যেন সাথে সাথেই পূরণ করে দিয়েছেন। এর শুকরিয়া না জানালে কি হয়। মসজিদে দান করবে আর ফকিরদের জন্য দান করবে কাজল আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল। 

কিন্তু আজকে আসার সময় লুকিয়ে একটা ফুল আনতে ভুল করেনি। সুযোগ বুঝে সখার হাতে ফুলটি দিয়ে আনন্দে আত্নহারা। কে জানে আজকে এত আনন্দ হবে।  কাজল নিজকে যেন আজ আবার নতুন করে খুঁজে পেল। এ আনন্দ রাখার অস্থিরতা কাজল সামলাতে না পেরে সখার কাছে গিয়ে বলল। 

পাশের দিকে আঙুলের ইশরা করে অই দেখ এটা কি সবাই অই পাশে দৃষ্টি ফিরাতেই কাজল তার আসল কাজটা করে নিল। কারো চোখেই ধরা পরেনি কাজলের চালাকি। শুধু সখায় তার অনুভুতি বুঝতে পারল। কাজল তার মনের মানুষের গালে চটপট করে একটি স্বর্গ সুধা চুমু একে দিয় পালালো।


সখা আজ আর পড়তে বসেনি। লোক দেখানো অভিনয় করলেও।    


পড়ার টেবিলে মন নেই। মন যেন আজ সত্যি সত্যি কেউ কেড়ে নিয়েছে। ভাবতে ও খুব ভালো লাগছে যাকে মনে মনে চেয়েছিলাম সেও যেন আমার মনের কথা বুঝে গেছে। নানান কথা নানান ভাবনা মনে উঁকি দিচ্ছে। ঢেউ এসে তীরে ছুঁয়ে মন উতলা করে দিচ্ছে। কি হল কি হবে। 


কাজলের একই অবস্থা। বিছানায় শুয়ে শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে। মাঝেমধ্যে মা বাবাকে দেখানো পড়ার শব্দ করছে। লজ্জায় নিজকে অপরাধী করছে। এই আমি কি করলাম এখন সখার সামনে কি ভাবে যাবো। সখা কি ভাববে। সখা কি আমাকে ভালেবাসে। সে কি আমার হয়ে থাকবে। নানান প্রশ্ন নানান কথা। কাজলের মুঠোফোনে সাইলেন্ট কম্পন বেজে ওঠে। দেখতে পেলো সখা ফোন করছে। এখন কি করব কি বলব।  ভাবতে ভাবতেই ফোন কেটে গেল।  আবার কল এলো কম্পন হচ্ছে মোবাইল সেই সাথে কম্পন হচ্ছে কাজল ও। বুকের হৃদপিণ্ডটা ধুকপুকানি যেন আরো বেড়ে গেল। 


শেষ মুহূর্তে রিছিপ বাটনে চাপতেই ফোনটি কেটে গেল। সখা এদিকে ফোন দিয়ে আরো অস্থির হয়ে ওঠে। রাগে পেঁচি ফোন ধরছেনা কেন। কি করছে আমার ফোন না ধরে থাকতে পাড়ল। এই ভাবতে ভাবতে সখার ফোনটি বেঁজে উঠল। এই মুহূর্তে কাজল ছড়া আর কে হবে, কিন্তু নাম্বারটা দেখে বিশ্বাসটা আর থাকলনা। ঢাকা থেকে খালামনি ফোন করেছে। কিরে কি অবস্থা। এখন কেমন আছিস। জ্বর কি আর এসেছে? বাপরে এক সাথে এত প্রশ্ন যাই হোক ভালই হলো সবগুলো একসাথেই উত্তর একবাটনে সমাধান জ্বি খালামনি ভালো আছি। আপনারা সবাই কেমন আছেন। খালামনি বলল এই তো ভালো আছি। সখা- খালা তকি আংকেল কেমন আছেন? হুম ভালো আছে। আংকেল আমার জন্য যা করেছে চিরকৃতজ্ঞ। এ ঋণ শোধরানোর যাবেনা। খালামনি হ এভাবেই বেকুবের মত বাড়িছেড়ে আবার পালাইও। শোধরাতে পারবে। জ্বি খালা দোয়া করবেন। মনে মনে সখা একি বললাম। জিহ্বায় কামড় কেটে। খালামনি আর পন্ডিতে বাদ দেও সামনে পরিক্ষা মন দিয়ে পড়ো। দে দে তোর মার কাছে দে। এই মুহূর্তে মা ও এসে সামনে উপস্থিত। না হলে কিছু বলে কেটে দেওয়া যেতো। কিরে কে ফোন দিয়েছে। খালামনি নেন মার সাথে কথা বলেন। 


সখা মনে মনে আর সময় পেলনা কল করার জন্য। এদিকে কাজল রেগেমেগে অস্থির বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে একবার টেবিলে একবার খাটের উপর একবার জানালার কাছে। বারবার ব্যস্থ দেখাচ্ছে কার সাথে এত কথা।  কি এমন কথা আমার ফোনটা ধরার সময় নেই। রাগে অভিমানে ফোন অফ করে নিল।  অফ করে যেন আরো বেশী কষ্ট পাচ্ছে আবার চালু করে আবার ফোন ব্যস্ত। কষ্ট জ্বালা আরো বেশি বেড়ে গেল। নানান টেনশন চিন্তা মাথায় ঘুরঘুর করছে। সখা কি আমাকে বুঝে আমাকে ভাবে। না না আমি যে আর পারছিনা। সখা আমার আমার আর কারো হতে পারেনা পারেনা।


রাগে অভিমানে কাজল তার ফোনটি বন্ধ করে রেখে দিল। এখন রাত নয়টা বাজে মা এসে ভাত খাওয়ার জন্য বলেগেল সাথে সাথে না জানিয়ে দিল। মা ভাবছে ব্যপার কি সে তো এরকম করে কথা বলেনা। আবার এলো কিরে কাজল শরীর খারাপ। না মা ভালো লাগছে না। ভালো না লাগলে ভাত খেয়ে শুয়ে থাক। না মা ভাত খাবনা। একটু আগে নাস্তা করেছি এখন খিদে নেই। আচ্ছা তাহলে শুয়ে থাক। 


সখা বারবার ফোন দিচ্ছে কিন্তু ফোন বলছে এই মুহূর্তে সংযোগ দেওয়া সম্ভব না। ব্যপার কি কাজল তো এই সময় ফোন বন্ধ করেনা। কি হল সমস্যাটা কি? মাথায় আর কিছুই কাজ করছেনা। এই মুহূর্তে কাজলকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। তার সাথে কথা বলতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। কি করি কি করব। ওফ এ আর হচ্ছে না। এখনি যেতে হবে কাজলের সাথে দেখা করতে হবে।  কিন্তু এত রাতে কি করে কি ভাবে...  একবার চুপি দিয়ে দেখল মা বাবা ঘুমিয়েছে কিনা। না ঘুমাই নি মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে যাবে। এখন রাত দশটা বাজে সখা দেখতে পেলো মা বাবা ভাই সবাই শুয়ে গেছে। 


কিছুক্ষণ পর চুপিচুপি পা টিপে টিপে ধীরে স্থিরে ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়ল সখা। রাতের আঁধারে এত রাতে এই প্রথম সখা কাজলের বাড়িতে যাওয়ার জন্য লোকলজ্জা জ্বিনভূতের ভয় নেই আজ মনে। আজ কি হল মনে এত সাহস এমন ইচ্ছে সখা অন্যরকম পুলক উপলব্ধি করছে। কাজলের সাথে দেখা করেই আবার ফিরে আসবে। শুধু এক পলক দেখতে ইচ্ছে করছে। একটিবার ঐ মিষ্টি কন্ঠের মিষ্টি কথাটা শুনেই সখা চলে আসবে। ভাবতে ভাবতে কাজলের বাড়িতে চলে এলো নিঝুম রাত বিদ্যুৎএর আলোর মত পূর্ণিমার আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। কাজলের শখের বাগান থেকে হাসনাহেনা কামিনী বেলী ফুলের সুবাস স্বাগত জানাল। 


ভয়ে বুকটা ধুকপুকানি বেড়ে গেছে। হাতদিয়ে চেঁপে ও থামাতে পারছেনা। কেউ দেখলে কি বলবে কি হবে।  একবার সামনে একবার পিছনে ফিরে আসে। আবার এগিয়ে যায় এতদূর যেহেতু এসেছি একটি পলক যে করেই হোক দেখা করে যায়। মনে হচ্ছে সবাই ঘুমিয়ে গেছে কাজলের রুমে লাইট জ্বলছে। ভালই হল। কাজল এখনো ঘুমাইনি  তাহলে। জানালার কাছে গিয়ে আস্তে করে কাজল আমি সখা। কাজল যেন এই ধ্বনিটি শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিল। স্বপ্নের মত পুলকিত হয়ে ওঠে কাজল আবার শুনতে পেল আমি সখা। কাজল যেন প্রাণ ফিরে পেলো। ধূধূ মরুর বুকে পিপাসিত প্রাণের মত এক ফোঁটা বৃষ্টির পরশে সজীব সতেজ হয়ে ওঠল।


কাজল জানালা খুলে দেখল সখা একা দাড়িয়ে আছে চাঁদের রূপালি আলোয় সখাও যেন রূপালী দেখাচ্ছে। সখা কিরে তুই আমাকে কি করেছিস। আমি তোর সাথে দেখা না করে আর কিছুতেই

থাকতে পারছি না তাই চলে এলাম এত রাতে। কাজল বাপরে আমার নায়কের তো ভাল সাহস বেড়ে গেছে দেখছি.. 

এর পর চলবে...

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts