চা উৎপাদনে আবার সুসময় ফিরেছে

এক বছর খারাপ যাওয়ার পর দেশে চা উৎপাদনে আবার সুসময় ফিরেছে। চলতি বছর বেশির ভাগ সময় আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। পাশাপাশি চায়ের দাম ভালো থাকায় মালিকেরাও বাগানের ভালো যত্ন নিচ্ছেন। সব মিলিয়ে বছর শেষে চা উৎপাদন বেশ ভালো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দেশে চা উৎপাদন ভালো হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর রেকর্ড পরিমাণ চা উৎপাদিত হয়। এরপর গত বছর ছন্দপতন ঘটে। এবার আবার উৎপাদন বেড়েছে। বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাস পর্যন্ত চলতি বছরের ১১ মাসে কোটি ৬০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। বছর শেষে তা কোটি ২০ লাখ কেজিতে উন্নীত হবে বলে ধারণা বোর্ডের কর্মকর্তাদের।
অবশ্য বছরের শুরুটা ভালো ছিল না। চা বোর্ড বাগানমালিকেরা জানিয়েছেন, বছরের প্রথম দুই মাসে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে চা উৎপাদন কম হয়। ফলে সার্বিক উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। ফেব্রুয়ারির পর থেকে পর্যন্ত আবহাওয়া চা উৎপাদনের অনূকূলে ছিল। জানতে চাইলে চা বোর্ডের উপপরিচালক (পরিকল্পনা) মো. মুনির আহমেদ বলেন, চা উৎপাদনে এখন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। আবার উৎপাদন বাড়ানোর জন্য দেশের চাবাগানগুলো নিয়মিত তদারকির আওতায় আনা হয়েছে। চা উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের মজুরি বাড়ানোয় তাঁদের কর্মদক্ষতা বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, চাবাগানের জমি যাতে ভিন্ন কাজে ব্যবহার না হয়, সেটিও মন্ত্রণালয় কঠোরভাবে যাচাই করছে। উৎপাদন বাড়াতে এমন নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়ার কারণেই গত বছরের চেয়ে এবার উৎপাদন বেড়েছে।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৫৪ সালে সিলেটের মালিনীছড়া চা-বাগানের মাধ্যমে প্রথম বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে নিবন্ধিত চা-বাগানের সংখ্যা ১৬৪। চা চাষের জমির পরিমাণ লাখ ৭৫ হাজার ২১৭ একর। সবচেয়ে বেশি চা-বাগান রয়েছে মৌলভীবাজার জেলায়। ছাড়া হবিগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, পঞ্চগড় রাঙামাটি এলাকায় চা চাষ হচ্ছে। চা উৎপাদনের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৬ সালে দেশে রেকর্ড পরিমাণ কোটি ৫০ লাখ ৫০ হাজার কেজি চা উৎপাদন হয়। গত বছর চা উৎপাদন নেমে আসে কোটি ৮৯ লাখ ৪৯ হাজার কেজিতে।
নিলামে চায়ের দাম ভালো পাওয়ায় বাগানমালিকেরাও চা উৎপাদনে নানা পদক্ষেপ নিয়েছেন। এইচআরসি গ্রুপের চা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস  বলেন, মালিকেরা চাবাগান সংস্কার করছেন। এর সুফল পাওয়া যাবে আগামী বছরগুলোতে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে বাড়বে।

চাহিদাও বাড়ছে
চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদন বাড়লেও চায়ের চাহিদা প্রতিবছরই বাড়ছে। নির্বাচনের কারণে বছর চায়ের চাহিদা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি। ফলে ঘাটতি মেটাতে চা আমদানি করতেই হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। গত নভেম্বর পর্যন্ত বছর প্রায় ৬৫ লাখ কেজি চা আমদানি হয়েছে। রপ্তানি বাদ দিয়ে আমদানি উৎপাদন মিলে নভেম্বর মাস পর্যন্ত দেশে চায়ের সরবরাহ ছিল কোটি ১৯ লাখ কেজি। দেশে চায়ের বাজারের আকার এখন তিন হাজার কোটি টাকার বেশি।
চা বিপণনের নিয়ম অনুযায়ী, দেশের বাগানে উৎপাদিত চা নিলাম বাজারে ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে বিক্রি করতে হয়। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে বা সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সপ্তাহে একবার করে চায়ের নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলাম থেকে চা কেনার পর শুল্ক-কর পরিশোধ করে বাজারজাত করেন ব্যবসায়ীরা। নিলামের পাশাপাশি বাগানমালিকেরা নিজস্ব বাগানে উৎপাদিত চায়ের একটা অংশ চা বোর্ডের অনুমতি নিয়ে নিজেরাই কিনতে পারেন।

দাম ভালো
নিলাম বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩২টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সোমবার শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত হবে চায়ের ৩৩তম নিলাম। শ্রীমঙ্গলে নিলামে ২৮ লাখ ৮৮ হাজার কেজি চা বিক্রির জন্য তোলা হবে। প্রতি মৌসুমে ৪৫টি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়।
এর আগে অনুষ্ঠিত হওয়া ৩১টি নিলামে গত বছরের চেয়ে ভালো দাম পেয়েছেন বাগানমালিকেরা। গত বছর নিলাম বাজারে প্রথম ৩১টি নিলামে চায়ের গড় মূল্য ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ২১৪ টাকা। এবার একই সংখ্যক নিলামে চায়ের গড় মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ২৭৪ টাকা। এই ৩১টি নিলামের মধ্যে চারটি নিলামে চায়ের গড় দাম ছিল কেজিপ্রতি ৩০০ টাকা।

 

Related Posts