ত্বকের যত্নে ফেসিয়াল A To Z | কোমল ও সুন্দর ত্বক পান ঘরে বসেই! (শেষ পর্ব)

আজকের পর্বে আপনাদের সাথে আলোচনা করবো স্টিমিং, ব্ল্যাকহেড রেমোভিং, টোনিং, ট্রিটমেন্ট এবং ময়েশ্চরাইজিং নিয়ে। সেইসাথে কিছু টিপস এবং ট্রিকস এর মাধ্যমে কিভাবে ঘরোয়া উপায়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই বাড়িতে বসে ফেসিয়াল করবেন তা নিয়ে আজকের পোস্ট।
তাহলে চলুন জেনে নেয়া যাক সেই সব ধাপসমূহ সম্পর্কে---

★স্টিমিং মানে গরম ভাপ দেওয়া। এতে স্কিন রিলাক্স হয়।  স্টিমিং করার ফলে ত্বকের পোরসগুলো খুলে যায় এবং ত্বকের ভেতরকার ময়লা দূর হয়। স্টীমিং করার অনেকগুলো উপায় আছে। ঘরোয়া উপায়ে আপনি নিতে পারেন এমন স্টিম।
একটি বাটিতে কুসুম গরম পানি নিন এবং তা থেকে গরম পানির ভাপ মুখে নিন। পানিতে টাটকা গোলাপের পাপড়ি, তুলসি এবং পুদিনা পাতা নিতে পারেন। খেয়াল রাখতে হবে স্টিম যেন অনেকক্ষণ ধরে নেয়া না হয়। তৈলাক্ত এবং স্বাভাবিক ত্বকে ৭/৮ মিনিট এভাবে ভাপ নিতে পারেন। তবে শুষ্ক ত্বকে ২/৩ মিনিট ভাপ নিলেই যথেষ্ট। স্টিমিং করতে না চাইলে একটি তোয়ালে সহনীয় গরম পানিতে ভিজিয়ে হালকা করে মুখের উপর চেপে ধরুন ৫ মিনিট। যাদের ত্বক শুষ্ক এবং সংবেদনশীল তারা স্টিমিং করবেন দুই মিনিট।

★ফেসিয়ালের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল মুখের থেকে অবাঞ্ছিত ব্ল্যাকহেড দূর করা। স্টিমিং এর পর এটা দূর করা অনেক সহজ হয়ে যায়। কিন্তু অনেক সময় ঘরে ফেসিয়াল করার সময় ব্ল্যাকহেডস সম্পূর্ণ দূর হয় না।
এক্ষেত্রে নিচের প্যাক টি ব্যাবহার করতে পারেন---
১চা.চামচ দুধ, আধা চা.চামচ জেলাটিন (ফ্লেভার ছাড়া),কয়েক ফোটা লেবুর রস সব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে ১ মিনিট ওভেনে রাখুন মিশ্রণটি মেল্ট হবার জন্য। মেল্ট হয়ে গেলে হালকা গরম থাকতে নাকের উপর লাগিয়ে রাখুন। শুকিয়ে গেলে উঠিয়ে ফেলুন। ফলাফল দেখে নিজেই চমকে যাবেন।

★টোনিং করার ফলে ত্বক ঠান্ডা হয় এবং ত্বকের খুলে যাওয়া পোরস বন্ধ হয়। টোনার ত্বক উজ্জ্বল করে ও ত্বকের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করে। ঘরোয়া উপায়ে ত্বকের জন্য ফলের তৈরী কয়েকটি টোনার তৈরীর প্রক্রিয়া জেনে নিই--

১। কমলার রসের টোনার
তিন চার টেবিল চামচ কমলার রস এবং লেবুর রস একসাথে মেশান। এর সাথে যেকোন এসেনশিয়াল অয়েল মেশাতে পারেন। এই মিশ্রণটি তুলোর বলে লাগিয়ে ত্বকে ব্যবহার করুন। কিংবা একটা স্প্রে বোতলে এই মিশ্রণটি ভরে ত্বকের উপর স্প্রে করুন। নিয়মিত এই টোনার ব্যবহার করুন।

২| আপেলের টোনার
একটি আপেলের অর্ধেকটা কুচি করে কেটে রস বের করে নিন। এতে মেশান ২ টেবিল চামচ মধু। এই মিশ্রণ মুখে লাগান এবং ১০ মিনিট পর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এই মিশ্রণটি ফ্রিজে রেখে ১ সপ্তাহ ব্যবহার করতে পারবেন।

৩। শসা এবং টকদই টোনার
এক কাপ টকদইয়ের সাথে কিছু পরিমাণ শসার রস মিশিয়ে নিন। এবার এই মিশ্রণটি মুখ এবং ঘাড়ে ভাল করে লাগান। এটি ৫-১০ মিনিট ত্বকে রাখুন। তারপর পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এটি তৈলাক্ত এবং স্বাভাবিক ত্বকের জন্য উপযোগী।

৪। পেঁপের টোনার
৬-৭টি পেঁপের টুকরো চটকে নিন। এর সাথে দুই-তিন টেবিল চামচ অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার মেশান। একটি তুলোর বলে এই মিশ্রণটি ত্বকে ব্যবহার করুন। নিয়মিত ব্যবহারে এটি দ্রুত ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি করবে।

৫। স্ট্রবেরী স্কিন টোনার
এক মুঠো স্ট্রবেরী পেস্ট করে নিন। এরসাথে চার-পাঁচ ফোঁটা গোলাপ জল মেশান। এই মিশ্রণটি ত্বকে টোনার হিসেবে ব্যবহার করুন। একটি এয়ার টাইট বোতলে রেখে সংরক্ষণ করতে পারেন।

★ফেসিয়ালের প্রথম ৬টি ধাপের পর ত্বক কিছুটা সংবেদনশীল হয়ে পরবে। এর জন্য দরকার ট্রিটমেন্ট। সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া ত্বককে ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে স্বাভাবিক করে নেয়া হয়। ট্রিটমেন্টের এর জন্য যে কোন ভালো তেল, যেমন – অলিভ ওয়েল , আমন্ড ওয়েল অথবা নারিকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন। যে কোন একটি তেল কয়েক ফোটা  মুখে মেখে ৫ মিনিট রেখে ভেজা ঠান্ডা রুমাল দিয়ে মুছে নিন। তারপর কয়েকটি আইসকিউব পাতলা কাপড়ে পেচিয়ে পুরো মুখে কিছুক্ষন ঘসে নিন।

★ময়েশ্চারাইজ করার ফলে ফেসিয়াল ফলপ্রসূ হয় এবং ট্রিট এর তেল টাকে ত্বকে লক করে রাখে। মার্কেটে অনেক ধরণের ফেসিয়াল সিরাম এবং ময়েশ্চারাইজার পাওয়া যায় । আপনার স্কিন টাইপ অনু্যায়ী ময়েশ্চারাইজার বেছে নিতে পারেন । প্রাকৃতিক সবচেয়ে ভালো ময়েসচারাইজার হচ্ছে অলিভ অয়েল এবং বাটার। ১ চা চামচ অলিভ অয়েল কিংবা বাটার হাতে নিয়ে ১০ মিনিট মুখে ভালো করে ম্যাসাজ করুন। চাইলে গ্লিসারিনও ব্যবহার করতে পারেন। শুষ্ক ত্বকের জন্য গ্লিসারিন ভীষণ উপকারী।

কত সহজেই মাত্র ৯টি ধাপে ঘরে বসেই ফেসিয়াল করে নেয়া যায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে। আপনি ঘরে বসেই খুব সহজে এবং কম সময়ে এই সহজ ধাপগুলো অনুসরণ করে বাসায় বসেই ফেসিয়াল করে নিন আর নিজেকে আয়নায় দেখুন নতুন আরো দীপ্তিময় আভায়।

★প্রতিটা কাজের কিছু টিপস থাকে যা অনুসরণ করলে সেটা সহজ হয় এবং আরও ভালো ভাবে করা যায়। ফেসিয়াল করতেও কিছু টিপস এবং ট্রিকস আছে যা অনুসরণ করে ত্বকের যত্ন আরও সহজে এবং দ্রুত করা যায়। চলুন জেনে নেই সেই টিপস এবং ট্রিকস গুলো---

⚫টিপস
•ফেসিয়াল নিয়মিত করা উচিত,এতে ত্বকের ডেড সেল চলে যায় এবং ত্বক সজিব সতেজ হয়। ত্বকের ধরন অনুযায়ী ফেসিয়াল করা উচিত নয়ত ত্বকের ক্ষতি হতে পারে।

•ফেসিয়ালের ধাপ অনুযায়ী ফেসিয়াল করতে হবে। একটি পরিপূর্ণ ফেসিয়াল করার ৯ টি ধাপ রয়েছে। ফেসিয়ালের ধাপসমূহ হলো ক্লিনসিং, ম্যাসেজিং, স্ক্রাবিং, স্টিমিং, ব্ল্যাকহেড রেমোভিং, ফেসপ্যাক, টোনিং, ট্রিটমেন্ট এবং ময়েশ্চরাইজিং। এই ধাপগুলো অনুসরণ করে ফেসিয়াল করুন।

•আমরা অনেকেই জিমের ষ্টীম রুমে স্টিম নিই। কিন্তু ফেসিয়াল করার পর পরই এটি করা যাবে না। কেননা ফেসিয়ালেই চেহারায় গ্লো আনার জন্য স্টিম করা হয় যা পরবর্তীতে আবার স্টিম নেয়ার ফলে কমে যেতে পারে।

•আপনার ফেসিয়ালে যদি ব্লিচিং ক্রিম ব্যবহার করা হয়ে থাকে তবে পরবর্তী ১২ ঘণ্টার মধ্যে সাবান বা ফেশওয়াশ থেকে দূরে থাকবেন। এর ২টি কারণ আছে। একটি হল ব্লিচিং ক্রিমের সাথে সাবান রিয়াক্সন করে আপনার ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। আরেকটি কারণ হল ব্লিচিং ক্রিমের লক্ষ্য হল আপনার মুখের লোমের রঙ পরিবর্তন করা কিন্তু তাৎক্ষনিক ভাবে সাবান ব্যবহার করলে রঙটা লোমে বসবে না।

•সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি সব সময় ত্বকের শত্রু। কিন্তু যেহেতু আগেই বলেছি অনেক সময় ফেসিয়ালের পর ত্বক আরও বেশি নাজুক হয়ে যায় সেহেতু সূর্যের হাত থেকে ত্বককে রক্ষা করা জরুরী। ১০০% ফেসিয়ালেই স্ক্রাব বা পিল অন্তর্ভুক্ত থাকে যার ফলে ত্বকে এক ধরনের অরক্ষিত পর্দার সৃষ্টি হয় আর এই পর্দা সূর্যের তাপে সহজে বার্ন হয়।

•সুন্দর ত্বকের জন্য পানির কোনো বিকল্প নেই। শুধু ফেসিয়ালের পর নয়, সব সময়ই পানি পান করুন। এতে শরীর থেকে টক্সিন-জাতীয় পদার্থ বের হয়ে যাবে এবং ত্বক উজ্জ্বল হবে।

•ফেসিয়াল করার পরের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমোতে যাওয়ার আগে মুখে শুধু মাত্র ঠাণ্ডা পানির ঝাপটাই যথেষ্ট।

•ফেসিয়াল করার পর পরই মেক-আপ করাটা উচিত নয়। কেননা নাজুক ত্বকে মেক-আপের কারণে ইরিটেশন বা ইনফ্লামেসন দেখা দিতে পারে। ফেসিয়াল করার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কোন ধরনের মেক-আপ ব্যবহার না করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

⚫ট্রিকস
•কোন প্যাক লাগানোর আগে হাতে সেই প্যাকটি লাগিয়ে নিবেন এতে কারো যদি সেই প্যাকে এলার্জি থেকে থাকে তাহলে তা জানা যাবে।

•ব্ল্যাক হেডস এবং হোয়াইট হেডস বের করার টুলস না থাকলে আমরা যে ববি পিন বা কালো কালারের ক্লিপ ব্যবহার করি চুলের জন্য তার গোল পাশ দিয়ে ব্ল্যাক হেডস এবং হোয়াইট হেডস বের করা যাবে।

•ডার্ক সার্কেল দূর করার জন্য ফেসিয়ালের সময় আলু পেষ্ট করে চোখের উপরে দিয়ে রাখবেন।

•ফেসিয়াল শেষে অবশ্যই বরফ ত্বকে ব্যবহার করবেন। বরফ ব্যবহারে ত্বকের রেডনেস কমে যায় কোন ব্যাথা থাকলে বা পিম্পল থাকলে তা কমে যায়। পোর বন্ধ করতে সাহায্য করে বরফ।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts