নফল নামাজের ফজিলত

ফরজ ইবাদাতের কোনো বিকল্প নেই। ফরজ নামাজ আদায়ের পর যারা নফল নামাজ আদায় করেন তাদের প্রতি রয়েছে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমত। নফল নামাজ ও রোজার মাধ্যমে আল্লাহ ও রাসূল (সা:)-এর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়।

ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাত ছাড়া অন্যান্য নামাজকে নফল নামাজ বলে। নফল নামাজের কোনো সীমা নেই। যে যত বেশি পড়বে, সে তত বেশি সওয়াব লাভ করবে। মাকরুহ সময় ব্যতীত যখনই কেউ নফল নামাজ পড়তে চায় এবং যত বেশি পড়তে চায় তা পড়লে তার জন্য মঙ্গল এবং বরকতেরই কারণ হয়। মহানবী সা: বলেছেন, ‘রমজান মাসের নফল নামাজ অন্য মাসের ফরজের সমতুল্য’।

নফল নামাজের নিয়ত : নফল নামাজগুলো বেশির ভাগই সুন্নাত। তাই নিয়তে সুন্নাত বলা যাবে, নফল বললেও হবে; সুন্নত-নফল কোনো কিছু না বলে শুধু তাকবিরে তাহরিমা দিয়ে আরম্ভ করলেও হয়ে যাবে। নফল নামাজের নিয়ত করে তা ছেড়ে দিলে বা ভেঙে গেলে পরে তা আদায় করা ওয়াজিব হবে (হিদায়া)।

নফল নামাজের সূরা কিরাত : নফল নামাজ যেকোনো সূরা বা আয়াত দিয়ে পড়া যায়। নফল নামাজে সূরার তারতিব বা ধারাক্রম জরুরি নয়। সূরা কিরাত নীরবে পড়তে হয়, তবে রাতের নফল নামাজ ইচ্ছে করলে সরবেও পড়া যায়। নির্দিষ্ট সূরা কিরাত পড়ার অনুমতি থাকলেও তা জরুরি নয়।

তাহিয়্যাতুল ওজু : অজু শেষ করার পর কারো সাথে কথাবার্তা না বলে অজুর পানি শুকাবার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়া মুস্তাহাব। তাহিয়্যাতুল অজু খ্যাত এ নামাজ নারী-পুরুষ যে কেউ আদায় করতে পারেন। এ নামাজ দুই অথবা চার রাকাত আদায় করা যায়।

ফজিলত : মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ভালোভাবে অজু করে দুই রাকাত নামাজ পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে পড়বে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়’ (সহিহ মুসলিম)। একদা মহানবী (সা:) হজরত বেলালকে রা: জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এমন কী আমল করো যে আমি জান্নাতে তোমার খড়মের আওয়াজ শুনতে পেলাম? তদুত্তরে বললেন, আমি ওজুর পরপর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল ওজু নামাজ আদায় করি।

দুখলুল মসজিদ : দুখলুল মসজিদের নামাজ হচ্ছে, মসজিদে ঢুকে বসে পড়বার আগে যে দুই রাকাত নামাজ পড়া হয়। মহানবী সা: বলেছেন, ‘মসজিদে ঢুকে বসার আগেই প্রথমে দুই রাকাত ‘তাহিয়্যাতুল মসজিদ’ বা মসজিদে প্রবেশের নামাজ আদায় করবে’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)।
প্রতি ওয়াক্ত নামাজের ক্ষেত্রে মসজিদে গিয়ে বসার আগে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নেয়া যাবে। আর জুমার নামাজের ক্ষেত্রে খুতবার আগে মসজিদে প্রবেশ করে এ নামাজ আদায় করা উচিত।

উল্লেখ্য, ফজরের সময় হওয়ার পর থেকে সূর্য উদিত হওয়ার আগে পর্যন্ত সব ধরনের নফল নামাজ পড়া মাকরুহ। তাই তা ঘরে পড়া হোক, কিংবা মসজিদে। কাজেই ফজরের ওয়াক্ত হয়ে যাওয়ার পর তাহিয়্যাতুল ওজু ও দুখলুল মসজিদ পড়া উচিত নয়। তবে ফজরের সুন্নতের সাথে এ নামাজের নিয়ত করে নিলে তার সাওয়াব পাওয়া যাবে বলে আমরা আশাবাদী (সুনানে আবু দাউদ, ফাতহুল কাদির)।

চাশতের নামাজ : চাশত অর্থ হলো দিনের দ্বিতীয় প্রহর, মধ্যাহ্ন-পূর্ব বা মধ্য-পূর্বাহ্ন। সূর্য যখন আকাশে এক-চতুর্থাংশের ওপরে ওঠে এবং সূর্যের তাপ প্রখর হয়, তখন থেকে দ্বিপ্রহরের আগে পর্যন্ত অর্থাৎ ঘড়ির সময় অনুযায়ী গ্রীষ্মকালে সকাল ৯টা থেকে এবং শীতকালে সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে চাশতের নামাজের সময়। এ নামাজের রাকাতের সংখ্যা দুই থেকে বারো রাকাত।

ফজিলত : মহানবী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চাশতের দুই রাকাতের প্রতি যতœবান হলো, তাঁর সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয় (তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ)। মহানবী সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চাশতের ১২ রাকাত নামাজ আদায় করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি স্বর্ণের ঘর নির্মাণ করবেন’ (তিরমিযি ও ইবনে মাজাহ)।

মাসয়ালা : চাশতের নামাজের নিয়ত দুই রাকাত করে কিংবা চার রাকাত করে করা যায়।

আওয়াবিন নামাজ : মাগরিব নামাজের দুই রাকাত সুন্নাত আদায় করার পর আওয়াবিন নামাজ আদায় করতে হয়। দুই-দুই রাকাত করে ছয় থেকে বিশ রাকাত পর্যন্ত নামাজ আদায় করা যায়।

ফজিলত : মহানবী সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি মাগরিবের নামাজের পর ছয় রাকাত এভাবে পড়ে এবং তার মাঝে কোনো অনর্থক কথা বলে নাÑ তবে তাকে ১২ বছরের ইবাদাত পরিমাণ সওয়াব দেয়া হয়’ (তিরমিযি)।

তাহাজ্জুদের নামাজ : তাহাজ্জুদ শেষ রাতের নামাজ এবং অনেক বেশি মর্যাদাপূর্ণ নামাজ। কুরআন মাজিদের বেশ কয়েক স্থানে তাহাজ্জুদ নামাজের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ মহানবী সা:-কে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার তাকিদ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন, ‘এবং আপনি রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ুন। তা আপনার জন্য এক অতিরিক্ত কর্তব্য। নিশ্চয়ই আপনার প্রভু আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করবেন’ (সূরা বনি ইসরাইল : ৭৯)। মহানবী সা: নিয়মিত রাত জেগে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেছেন এবং সাহাবাদের রা:- এ নামাজের গুরুত্ব ও ফজিলাত বর্ণনা করে তা আদায়ে উৎসাহিত করেছেন।

ফজিলত : তাহাজ্জুদ নামাজের রাকাত সংখ্যা অন্তত পক্ষে দুই এবং ঊর্ধ্বতম সংখ্যা আট। এর ফজিলাত সম্পর্কে মহানবী সা: বলেছেন, ‘ফরজ নামাজগুলোর পরে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট নামাজ হলো তাহাজ্জুদ নামাজ’ (সহিহ মুসলিম)। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘তাহাজ্জুদ নামাজের ব্যবস্থাপনা করো, এটা হচ্ছে নেক লোকের স্বভাব। এটা তোমাদের আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে, গুনাহগুলো মিটিয়ে দেবে, গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং শরীর থেকে রোগ দূর করবে’ (সহিহ মুসলিম, আহমদ)।

ইশরাক নামাজ : সূর্য উদয়ের ১২-১৩ মিনিট পর যে দুই অথবা চার রাকাত নামাজ পড়া হয়, তাকে ইশরাক নামাজ বলে। ফজরের নামাজ পড়ার পর দুনিয়ার কাজকর্ম ও কথাবার্তা থেকে বিরত থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত স্বীয় নামাজের জায়গায় বা (পুরুষরা) মসজিদে অন্য কোনো জায়গায় বসে কুরআন তিলাওয়াত, জিকির-আজকার, তাসবিহ-তাহলিল ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকবেন।

ফজিলত : হাদিসে কুদসিতে মহানবী সা: বলেছেন, আল্লাহ বলেন, হে মানুষ! তুমি দিনের প্রথমাংশে আমার জন্য চার রাকাত নামাজ আদায় করো। তাহলে এ দিনে তোমার যা কিছু প্রয়োজন হয়, সবই আমি পূরণ করে দেবো। (তিরমিযি)।

অন্য এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই বসে থাকে এবং আল্লাহর নামে জিকর-আজকার করতে থাকে, এরপর আকাশে সূর্য ভালোভাবে উদয় হলে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, সেই ব্যক্তি এক হজ ও ওমরা আদায়ের সওয়াব পাবে’ (তিরমিযি)।

এ ছাড়াও সালাতুত তাসবিহ, সালাতুল হাজাত, সালাতু কাজায়িদ দাঈন বা ঋণ পরিশোধের নামাজ, সালাতুস শোকর, সালাতুত তাওরা, সালাতুল কুসুফ ও খুসুফ (চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণকালীন নামাজ) উল্লেখযোগ্য।

    Tags :

Related Posts