প্রাচীন যুগের ব্যবসা ও বাণিজ্য

ব্যবসা-বাণিজ্য:একটি শব্দ যা দ্বারা পণ্যদ্রব্য ক্রয় ও বিক্রয়ের কাজকে নির্দেশ করে। স্মরণাতীতকাল থেকে বাংলার অর্থনীতি ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে সমৃদ্ধি হয়ে আসছে। বাংলায় অসংখ্য নদী-নালা অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য উপযোগী সুবিধাজনক যোগাযোগ ব্যবস্থার পথ তৈরী করে দিয়েছিল।

প্রাচীন যুগ:আধুনিক ভারতবর্ষের অন্তর্গত পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যার কিছু কিছু এলাকা এবং বর্তমান বাংলাদেশের সম্মিলিত ভূখন্ড নিয়ে প্রাচীন বাংলা গঠিত ছিল। এই অঞ্চল সুদূর অতীতে চারটি প্রধান ভৌগোলিক এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। সেগুলি হলো পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়, বঙ্গ এবং সমতট, হরিকেল। ভৌগোলিক বিচারে বাংলার অবস্থান গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ এলাকায়। অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিম বঙ্গের বৃহত্তর ভূখন্ড নিয়ে গঠিত ছিল প্রাচীন বাংলা।

প্রাচীন বাংলায় ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি সমগ্র উপমহাদেশের প্রাচীন বাণিজ্যের সামগ্রিক পটভূমিতে বুঝতে হবে। সমগ্র উপমহাদেশের মতো প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক জীবন কৃষি অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্মশাস্ত্রে, বিশেষত অর্থশাস্ত্রে, বার্ত্তা (অর্থাৎ বিবিধ বৃত্তি বিষয়ক যে বিদ্যা)-র তিনটি প্রধান দিক কৃষি, পশুপালন ও বাণিজ্য উল্লিখিত হয়েছে।

উপমহাদেশের প্রাচীন বাণিজ্য বোঝার জন্য এক অমূল্য উপাদান অজ্ঞাতনামা গ্রিক নাবিকের রচনা পেরিপ্লাস টেস ইরিথ্রাস থালাস্সেস (The Periplus of the Erythraen Sea, আনুমানিক খ্রিস্টীয় প্রথম শতকের শেষ ভাগে রচিত)। এই গ্রন্থে গাঙ্গেয় বদ্বীপের নিম্নভাগ গ্যাঙ্গে বা গঙ্গা দেশ নামে অভিহিত। গ্যাঙ্গে অঞ্চলের প্রসিদ্ধ পণ্যের মধ্যে ছিল তেজপাতা এবং সুগন্ধী তেল, যাকে পেরিপ্লাসের লেখক বলেছেন নার্ড।

গাঙ্গেয় উপত্যকার সঙ্গে গাঙ্গেয় বদ্বীপের সংযোগ পরবর্তীকালেও অব্যাহত ছিল। পঞ্চম শতকে এই যোগাযোগের সূত্র ধরেই ফা-হিয়েন মগধ থেকে তাম্রলিপ্তি এসেছিলেন। হিউয়েন-সাং-এর ভ্রমণবৃত্তান্ত এই ক্ষেত্রে বিশেষ উপযোগী। নালন্দা থেকে যাত্রা শুরু করে হিউয়েন-সাং প্রথমে আসেন রাজমহলের নিকটস্থ কজঙ্গলে। সেখান থেকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে প্রথমে তিনি পুন্ড্রবর্ধন এবং তারপর আরও পূর্বে কামরূপে যান। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকাস্থিত কামরূপ থেকে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য ছিল দক্ষিণপূর্ব দিকে সমতটে। সমতট থেকে বেরিয়ে তিনি পশ্চিমদিকে আসেন তাম্রলিপ্তি পর্যন্ত। তাম্রলিপ্তি থেকে উত্তরদিকে যাত্রা করে তিনি পৌঁছেন শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণসুবর্ণ ও সন্নিহিত এলাকায়। মুর্শিদাবাদে অবস্থিত কর্ণসুবর্ণ থেকে বেরিয়ে তিনি ওড্র বা উড়িষ্যায় যান। এই ভ্রমণ তিনি করেছিলেন নিঃসন্দেহে প্রাচীন দন্ডভুক্তি (আধুনিক দাঁতন, মেদিনীপুর জেলা, পশ্চিমবঙ্গ) হয়ে। অতএব বাংলার চারটি প্রধান এলাকা (পুন্ড্রবর্ধন, রাঢ়, বঙ্গ ও সমতট) যেমন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তেমনি প্রাচীন বাংলার প্রতিবেশী এলাকা মগধ, কামরূপ ও উড়িষ্যার সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা যেত।

স্থলবন্দি গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে সমুদ্রযাত্রা করতে গেলে গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকা ও বাংলার তটীয় অঞ্চলই ছিল গমনাগমনের প্রধান সূত্র। বাংলার উপকূলবর্তী অঞ্চল যে বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করেছিল, তাতেও সন্দেহ নেই। ছয় থেকে তেরো শতকের লেখমালায় বারবার বলা হয়েছে নৌখাত, নৌযোগ, নৌযোগখাত, নৌ-দন্ডক, নৌবন্ধক, নৌস্থিরবেগ, নৌপৃথ্বীর কথা। গঙ্গাসহ অন্যান্য নদী যে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের এক প্রধান উপায়, তার পরিচয় এই বর্ণনায় বিধৃত। 

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts