বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-রপ্তানি

অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি বাড়াতে এবং ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। এর পাশাপাশি নতুন নতুন রপ্তানি গন্তব্যও খুঁজে বের করতে হবে। অনেকদিন থেকে আমাদের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য আনার ব্যাপারটি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে আমাদের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হওয়ার বদলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্রমেই তা হ্রাস পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশেষ করে পণ্য ও সেবা রপ্তানি নির্ভর দেশ হওয়ার যেসব উপকরণ প্রয়োজন, তার প্রায় সবই বাংলাদেশের রয়েছে। কিন্তু সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনার অভাবে এ সম্ভাবনাকে এতোদিন কাজে লাগানো যায়নি। অর্থনীতির আয়তন বেড়েছে বহুগুণ। তবে সে তুলনায় আমাদের রপ্তানি চিত্রে তেমন আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটানোর তাগিদ অনুভব করলেও পরিস্থিতির উন্নতি ঘটছে না মোটেও। একসময় এদেশের রপ্তানি বাণিজ্য পাটনির্ভর ছিল। তখন রপ্তানি পণ্যের তালিকা বলতে পাট, চা ও চামড়া নাম চলে আসতো। তখন রপ্তানি বাণিজ্য মূলত এই তিন পণ্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। তবে এখন পাট রপ্তানিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। অন্যান্য দেশ পাট উত্পাদনে নতুন বিপ্লবের সূচনা করেছে, তারা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পাট রপ্তানিতে পিছিয়ে পড়লেও গার্মেন্টস রপ্তানিতে বেশ এগিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম সেরা গার্মেন্টস সামগ্রী রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ দখল করে রেখেছে গার্মেন্টস পণ্য। এ দেশের গামের্ন্টস শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে প্রতিকূল কিছু পরিস্থিতি। প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে অনেক সময় পেরিয়ে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ একটি কিংবা দুটি পণ্যের উপর রপ্তানি বাণিজ্য নির্ভর হয়ে পড়াটাকে কোনোভাবেই পজেটিভভাবে গ্রহণ করা যায় না। যদি কোনো কারণে সংশ্লিষ্ট পণ্যটির রপ্তানিতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় তাহলে পুরো রপ্তানি বাণিজ্যে চরম সংকট ঘনীভূত হতে পারে।



যখন বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য পাটকেন্দ্রিক ছিল তখন এক ধরনের সুবিধা ভোগ করতো গোটা অর্থনীতি। পাট পণ্যটি ছিল সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় কাঁচামাল নির্ভর। ফলে এ থেকে আহরিত পুরো বৈদেশিক মুদ্রা জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতো। কিন্তু গার্মেন্টস শিল্পের বেশিরভাগ কাঁচামাল ও মেশিনারিজ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়ে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়ে। ফলে এখাতে মূল্য সংযোজনের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। আগামীতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে। নতুন নতুন দেশ আমাদের প্রতিযোগী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। তারা বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এতে করে রপ্তানি বাণিজ্যে নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে পণ্যের বহুমুখীকরণের অভাব। পাশাপাশি বাজার সম্প্রসারণ না করে গুটিকতক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ বয়ে গেছে গোটা রপ্তানি বাণিজ্য। যদি ইদানিং আমাদের রপ্তানি পণ্যের নতুন নতুন গন্তব্য খোঁজার চেষ্টা জোরদার হওয়ার এ ক্ষেত্রে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। গার্মেন্টস সামগ্রীর পর চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি তালিকায় উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। এখানকার কৃষিপণ্যের অনেক চাহিদা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তা রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনে তেমন বড় ধরনের সাফল্য চোখে পড়ছে না। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে গত কয়েক দশকে বেশ এগিয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশে তৈরি বিভিন্ন ওষুধের বেশ চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। এখন পৃথিবীর বহু দেশেই বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি আরো বাড়াতে হলে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষিপণ্যের উৎপাদনে উন্নতমান বজায় রেখে বিদেশি ক্রেতাদের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী মোড়কজাত করে রপ্তানির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts