বাংলা ও একজন বঙ্গ নেতার শেকড়ের সংক্ষিপ্ত জীবনী

ইবনে মনির হোসেন

মানুষ আসে মানুষের পাশে। আবার কালের পরিক্রমায় হারিয়ে যায়। কেউ বেঁচে থাকে কালের পর কাল, মহাকালের সোনালী অমর পাতায় লেখা থাকে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে।

আজ আমরা যে বাংলাকে সোনার বাংলায় গড়ার স্বপ্ন দেখি।এই স্বপ্নের সূত্রের ইতিহাসে অনেকেই মহানায়ক হয়ে আছেন। সেই মহানায়কের মাঝে তেমনি তিনি একজন, বীর সাহসী, মেধাবী বাংলার শেকড় ও বঙ্গ নেতা-

শেকড়ের ডাক বাংলার বাঘ,

শেরে'ই বাংলা এ কে ফজলুল হক।


অসীম সাহসিকতা অদমনীয়তার বল। বাংলার মানুষের প্রাণের স্পন্দন। যার সাহসিকতার কর্মে মানুষ নাম দিয়েছিল ততকালীন সময়ে বাংলার বাঘ, এই নামেই চির চেনা তাঁর নাম ডাক। কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কলমের জোরালো জোর শক্তির উৎসাহের মূল হোতা ছিলেন তিনি। নবযুগ পত্রিকার সহযোগী ব্রিটিশ বিরোধী  লেখার চেতনা সৃষ্টিকারী জনপ্রিয় নায়ক- পুরো নাম আবুল কাসেম এ কে ফজলুল হক, বিশ শতকের প্রথমার্ধের বাঙালি। জন্মভূমি বরিশাল, প্রাচীন নাম বাকলা চন্দ্রদ্বীপ। পটুয়াখালী জেলার বাউফল থানার বিলবিলাস গ্রামে বসতি স্থাপন করেন তাঁর পিতা কাজী মোহাম্মদ ওয়াজেদ, মাতা বেগম সৈয়দুন্নেছা। ১৮৭৩ সালে ২৬ শে অক্টোবর, ১২৮০ সনের ৯ কার্তিক। বরিশাল রাজারপুর সাতুরিয়া গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন।


বাল্যকাল থেকেই বিভিন্ন দিক থেকেই বেশ সুনামের সাথে ছিল। খেলাধূলা, শিক্ষায়, সৎ আদর্শ সাহসের সাথে ন্যায়ের পথে অবিচল। প্রথম হওয়ার প্রবণতা ছিল দুঃসাহসী। একবার এক ঘটনা তিনি বই একবার পড়ে'ই বইয়ের পাতা ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছেন। মা ব্যপারটি লক্ষ্য করলেন এবং ভৎর্সনা করলেন। ফজলুল হক বললেন মা আমার পড়াতো মুখস্থ হয়ে গেছে তাই ছিঁড়ে ফেলে দিচ্ছি। মা বিষয়টা পরীক্ষা করলেন তিনি ছেঁড়া পাতার সব পড়া মুখস্থ বলে গেলেন। ১৮৭৯ সালে ঐতিহ্যবাহী বরিশাল জেলা স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৮৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণীতে বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৮৯ সালে প্রবেশিকায় প্রথম বিভাগে কৃর্তিত্তের সাথে পাস করেন, ঢাকা বিভাগে মুসলিমদের প্রথম স্থানের কাতারে নিয়ে আসেন। ১৮৯৩ সালে তিনি একসাথে তিন বিষয়ে অনার্স নিয়ে প্রথম বিভাগে বি এ পাস করেন। এর পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ইংরেজি ভাষায় এম এ ক্লাসে ভর্তি হন এবং ১৮৯৫ সালে অঙ্কে এম এ পাস করেন।


তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী, রাজনৈতিক পদে ছিলেন কলকাতার মেয়র। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও গর্ভনর ছিলেন। তাঁর সুবিশাল বর্ণাট্য জীবনী। বরিশালের খ্যাতনামা আইনজীবী ছিলেন তার বাবা। ১৯০০ সালে বাবার পেশায় পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা আইনজীবী স্যার আশুতোষ মুখপধ্যায়ের সহকারী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে পেশা শুরু করেন। ১৯০৬ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পেয়ে ও ছেড়ে দিলেন। কারন ছিল সরকারের সাথে এক মত হতে না পেরে। তখন ঢাকা মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনে অংশনেন।১৯১৩ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য,  ১৯২৫ সালে মনোনীত হন বাংলার মন্ত্রীসভার সদস্য। ১৯২৭ সালে তিনি কৃষক প্রজাপাটি নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৪০ সালে জ্বালাময়ী বক্তৃতায় মুসলিম লীগের অধিবেশনে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রস্তাব আর সেখান থেকেই উপাধি শেরে'ই বাংলা অর্থাৎ বাংলার বাঘ নামে পরিচিতি পান। ১৯৩৭ সাল খেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত জনকল্যাণ মূলক কাজ করেন। প্রধানমন্ত্রীত্ব থেকে সারা বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করেন।


এর পর বিনাক্ষতি পূরনে জমিদারি প্রথা উচ্চেদ করেন।১৯৩৯ সালে মুসলমানদের জন্য শতকারা ৫০ ভাগ চাকরি নির্দিষ্ট রাখার ব্যবস্থা করেন। তখন ঢাকা, রাজশাহী,খুলনা, দৌলতপুরে কৃষি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সাখে নারী শিক্ষার গুরুত্ব প্রধান করেন। যুক্তফ্রন্ট দলের নেতৃত্ব দিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হন ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এর পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে নিযুক্ত হন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ১৯৫৬-৫৮ পর্যন্ত পাকিস্তানের গর্ভনর পদে।


এবার আসি বাংলার শেকড় ও বাংলার জন্মকথায়। নব্যপ্রস্তর যুগের নির্দেশন থেকে জানা যায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাংলাদেশে জনবসতি শুরু হয়েছে। আদিম সভ্যতার যুগে বন্য শিকারী জীবন ছেগে কৃষি জীবন শুরু করেন। নরতত্ববিদদের মতে নিগ্রোদের পর বাংলার প্রাচীন অধিবাসী অষ্টিকগন, এ জাতী অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হতে ইন্দোচিন হয়ে বাংলাদেশে আগমন। এর পর মোঙ্গলীয়গন।

ভাগ্যের অনষনে পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তিব্বত ও ইন্দোচিন হতে বাংলাদেশে জনবসতি প্রবেশ ঘটে। অষ্ট্রিক ও মোঙ্গলীয়দের সংমিশ্রণে প্রাচীন বাঙ বা বাঙাল সৃষ্টি জাতী। এর পর দ্রাবিড়, আর্য, ও মুসলমানদের প্রবেশ ঘটে আরব থেকে। ফলে একটি জনগোষ্ঠী আজকের বাঙালি জাতির সৃষ্টি হয়। 

বাঙ জনগোষ্ঠীর নামের সাথে আল যোগ হয়ে বাঙাল হয়েছে। বাঙ শব্দের অর্থ জলাভূমি। বাঙ জনগোষ্ঠী বন্যা ও জোয়ারের লবণাক্ততা জলাভূমি থেকে রক্ষা পেতে বাঁধ নির্মাণ করত। এদের ভাষা ছিল বাংলা। এরা বাস করত তখন দক্ষিণ ও পূববাংলায়। ৭৫৯ সাল 


১১২৪ পর্যন্ত রাজত্ব করেন পালবংশ। এ সময় বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন ভাষার সংমিশ্রণে চলতে চলতে বিদেশী ভাষাও বাংলা ভাষার প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠে রক্তেমাংসে। তাদের পর সেনবংশ ১২০৩ পর্যন্ত শাসন করেন। 


শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ সালে সমগ্র বাংলা কে একত্রিত করেন। শাহবাঙ্গাল উপাধি পান। তখন সিমানা ছিল উত্তরে হিমালয়, পূর্বে আসাম প্রদেশ ত্রিপুরা রাজ্য ব্রাহ্মদেশ, পশ্চিমে বিহার ও উড়িষ্যা প্রদেশ এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।  গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার পলি দারা বাংলার ভূভাগ গড়ে ওঠে আজকের বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।


১২০৩ থেকে ১৫৭৫ পর্যন্ত নিপীড়িত বৌদ্ধ, হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করেন। মধ্য প্রাচ্য হতে পাঠান, তুর্কি, ইরানি, আরবী মুসলমান বসতি স্থাপন করেন। ১৫৭৫ থেকে ১৬১১ পর্যন্ত বারভূঁইয়াগন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করেন। ১৬১১ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর বারভূঁইয়াদের পরাজিত করে বাংলা দখল করে। মোগল আমলে বাংলার একটি প্রদেশ ও ঢাকা রাজধানী ছিল। নবাবী আমলে রাজধানী ঢাকা হতে মুর্শিদাবাদে হয়। তাদের রাজ ভাষা ছিল ফার্সি। তখন আমলে ইংরেজ, পুর্তুগিজ- ও ফার্সি জাতি ভারত বর্ষে বাণিজ্যে আসে


কলকাতা, বোম্বে, মাদ্রাজ- প্রভূতি নতুন শহর প্রতিষ্ঠিত হয়। মোগল সম্রাট দেশীয় রাজাদের দূর্ভলতার সুযোগে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। সিরাজদৌলার প্রধান সেনাপতি মীরজাফর আলী খান ইংরেজদের ফাঁদে পা দিয়ে ষড়যন্ত্র করে ১৭৫৭ সালে সিরাজকে হত্যা করে। নামে মাত্র নবাববী পেলেন মভরজাফর আলী খান। প্রকৃত মালিক ছিল ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৭০ সালর বাংলাদেশে মন্বন্তর দেখা দেয় ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ যার ফলে ৩ কোটি অধিবাসীদের মধ্যে ১কোটি মারা যায়।১৭৯৩ সালে জমিদারি সৃষ্টি হয়। কৃষকরা হয় ওঠে ভূমি দাস। খাজনা আদায়ের কষাঘাতে শোষণ নিপীড়ন... 

১৮২০ থেকে ১৮৬০ সালে ফরিদপুরে হাজী শরিয়তুল্লাহ দুদু মিয়া ফরাজী আন্দোলন চলে। ১৭৬৩- ১৮০০ সালে উত্তর বঙ্গে ফকির বিদ্রোহ ১৭৯২ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা বরিশালে বালকি শাহের নীল চাষিদের বিদ্রোহ ১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমন করে। ইষ্ট ইন্ডিয়া শাসনের অবসান ভারত ই্যল্যান্ডের রাণী শাসনে অধিনে চলে যায়। ১৮৮৫ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা। ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু।১৯০৫ সালে বাংলা বিভক্ত হয়, পূর্ববঙ্গ আসাম, পশ্চিম বঙ্গ বিহার উড়িষ্যা প্রদেশ গঠিত হয়। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ  রহিত হয় পূর্ব ও পশ্চিম বঙ্গ নিয়ে বাংলা প্রদেশ গঠন করা হয়। তখন ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তিত হয়। সেই তখন বাংলা বন্ধু নায়ক হয়ে আসেন সাহসী  বীর আবুল কাসেম ফজলুল হক। এর আবির্ভাব উনিশ শতকে। ১৯৩২ সালে আদমশুমারীতে দেখা যায় বাংলাদেশে ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা শতকারা ৩০ জন। অতছ ১৮২৪ সালে বাংলাদেশে ভূমিহীন কোন কৃষক ছিলনা। 


ব্রিটিশ শাসনের সময়কাল এতই খারাপ ছিল প্রতিবাদ করার কেউ কোন সাহস পেতনা। কখনো যদি কেউ কোন বাঁধা দিতো তখন তাদের ঘর বাড়ির স্ত্রী সন্তান সম্পত্তি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিত। শোষণ শাসনে জমিদারি প্রথা মহাজনি ব্যবসা লুটতরাজ জোর যার তারই ছিল। সাধারণ কৃষকদের কাধে চেপে বসে ব্রিটিশ শাসন। সেই সংকটময় আঁধার রাতে চাঁদের জ্যোতি হয়ে জেগে উঠে মেহনতি মানুষের বন্ধু হয়ে। জনতার দুর্দিনের সাথী হয়ে স্বজাতীর অধিকার আদায় করেন আবুল কাসেম ফজলুল হক। আজকের এই সোনার বাংলাকে সোনালী রূপান্তরিত পথে নিয়ে আসেন অনেকের মধ্যে তিনিও একজন অন্যতম। বাংলার কৃষক সমাজের বন্ধু, অশিক্ষা দারিদ্র্য জরাগ্রস্ত কুসংস্কার, নিমজ্জিত, জমিদারি মহাজনের কবল থেকে শোষণের দিশেহারা মানুষ কে পথ দেখান। কে দিবে আশা কে দিবে ভালোবাসা। কে দিবে বেঁচে থাকর বল কে দিবে প্রতিবাদের ভাষা। সেই তখন সাহসী বারবার বলি বলিষ্ঠ নাবিক ডাল ভাতের অধিকার আদায়ের রাজনিতী করেছেন তিনি। কালের গর্ভে ইতিহাসের পাতায় অমর হয় আমাদের মাঝ থেকে হারিয়েযান ২৭ শে এপ্রিল ১৯৬২ সালে পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান ঢাকা ৮৮ বছর বয়সে। সমাধিস্থল তিন নেতার মাজার।

সম্মাননা রয়েছে রাজধানী ঢাকায় তাঁর নামে শেরেবাংলা নগর, ক্রিকেট স্টেডিয়াম, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি আরো অনেক। যা এই অল্প কথায় বলে শেষ করার মত নয়।

Related Posts