ব্যাংক থেকে সরকারের বেপরোয়া ঋণ গ্রহণ

আর্থিক সংকট মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে বেপরোয়াভাবে ঋণ নিচ্ছে। নির্বাচনী ব্যয়সহ চলতি ব্যয় মেটাতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে এসব ঋণ নেয়া হচ্ছে। প্রায় সব ঋণই বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া হচ্ছে।

গত সপ্তাহে তিন দিনে সরকার ১৯টি ব্যাংক থেকে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা ধার করেছে। এদিকে সরকারকে ঋণের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলো বিপাকে পড়েছে। একদিকে ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবাহ কমেছে, অন্যদিকে ঋণপ্রবাহ বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোতে নগদ টাকার টানাটানি শুরু হয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে তিন হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা নতুন ঋণ নিয়েছে। অথচ গত অর্থবছরের একই সময় ব্যাংক থেকে সরকার কোনো ঋণ নেয়নি। উল্টো আগের নেয়া ঋণের পাঁচ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছিল। এদিকে ১৯ ডিসেম্বরে সরকার ট্রেজারি বন্ড ও বিল বিক্রি করে এক হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ৩০৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৬৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়েছে সরকার। রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় সরকারি হিসাবে যথেষ্ট অর্থ জমা নেই।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবরে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ছয় শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আদায় সাড়ে ২২ শতাংশ বেড়েছিল। আয় না বাড়ায় ঋণ নিয়ে সরকারকে চলতি ব্যয় মেটাতে হচ্ছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনের কারণে সরকারের সার্বিক ব্যয়ের পরিমাণও বেড়ে গেছে। ফলে নির্বাচন অগ্রাধিকার হিসাবে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নির্বাচনী বছরে সরকারের বেশি ব্যয় হবে এটাই স্বাভাবিক। এ ব্যয় মেটানোর জন্য আগে থেকে অর্থ মজুদ রাখতে হয়। কিন্তু নানা টানাপড়েনে সরকার হয়তো এটা রাখতে পারেনি। এ কারণে সরকার ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু এমন সময়ে ঋণ নিচ্ছে, যখন ব্যাংকে আমানত প্রবাহ কমে যাচ্ছে। এদিকে গত জুলাই-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেয়া আগের ঋণ বাবদ এক হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে সরকার। গত অর্থবছরের একই সময়ে পরিশোধ করেছিল এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। ১৯ জুন নতুন করে ৬৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ নেয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের অংক বেড়ে গেছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে আমানত প্রবাহ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯১ শতাংশ। এর মধ্যে চলতি আমানত কমেছে ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং মেয়াদি আমানত বেড়েছে দুই দশমিক ২১ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে আমানত প্রবাহ বেড়েছিল ১০ দশমিক ১৪ শতাংশ। এর মধ্যে চলতি আমানত বেড়েছিল ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং মেয়াদি আমানত বেড়েছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। এর বিপরীতে চলতি অর্থবছরের অক্টোবর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ ঋণপ্রবাহ বেড়েছে দুই দশমিক ৬১ শতাংশ।

গত অর্থবছরের একই সময়ে বেড়েছিল তিন দশমিক ৬১ শতাংশ। গত বছরের চেয়ে এবার আমানত প্রবাহ বৃদ্ধির হার ৯ শতাংশের বেশি কমেছে। আমানত কমার বিপরীতে ঋণ প্রবাহ বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো অর্থ সংকটে ভুগছে। এ সংকট মোকাবেলা করতে গত সপ্তাহে তিন দিনে ১৯টি ব্যাংক থেকে তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা ধার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সরকারি ব্যাংকের একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, আমানত বাড়াতে নানামুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এরপরও বাড়ছে না। এতে ব্যাংকগুলো চাপে আছে।

 

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts