রমজান মাসের ইবাদত

রজব মহিমান্বিত মাসের মধ্যে একটি মাস। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, যখন আকাশ ও জমিনকে তিনি সৃষ্টি করেছেন তখন থেকেই তিনি ১২টি মাসের গণনার বিধান করেন। তার মধ্যে চারটি মাস মহিমান্বিত মাস। এটাই প্রতিষ্ঠিত বিধান।


এতে তোমরা নিজেদের ওপর জুলুম কর না। (সূরা তওবা, আয়াত-৩৪)। এ মাস আমাদের রমজানের ইবাদতের জন্য প্রস্তুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, আমি রসুলেপাক (সা.)-কে রজব ও শাবান মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখেছি, রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে এত রোজা রাখতে দেখিনি। স্রষ্টার পরে মাখলুকের মধ্যে রসুলেপাক (সা.) এর প্রথম স্থান হওয়ার পরেও তিনি রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে রজব মাস থেকে রোজা রাখা শুরু করতেন। আর আমাদের অবস্থা কী? এ রজব মাস ইসলামের প্রথম রসুল হজরত নুহ (আ.)-এর ইমানি দাওয়াতের ঘটনাও এ পথে জুলুম নির্যাতন সহ্য করার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশেষ করে তাঁর যুগে শিরকের সূচনা ও শিরকের বিপর্যয়ের ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়। ইসলামের শেষ রসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইমানের দাওয়াতের পথে কষ্ট, নির্যাতন, জুলুম সহ্য করার কারণে খোদ আল্লাহতায়ালা মেরাজের মাধ্যমে তাকে সম্মান প্রদান ও সান্ত্বনা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন তা স্মরণ করিয়ে দেয়। উল্লেখ্য, হজরত নুহ (আ.)-এর আগে বহু নবী ছিল। কিন্তু রসুল ছিল না। প্রথম রসুুল হলো হজরত নুহ (আ.)। আল্লাহতায়ালা হজরত নুহ (আ.) এবং তার সহচরদের নৌকাতে আরোহণ করিয়ে শিরকের বিরুদ্ধে রজব মাসের প্রথম তারিখে বিজয় দান করেছিলেন। কোরআনে কারিমে আছেÑহজরত নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে সাড়ে ৯শ’ বছর আল্লাহ তায়ালার দিকে আহ্বান করেছিল।


তিনি বলেছেন, হে আমার জাতি! আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো প্রভু নেই। এ কথার স্বীকৃতি দাও যে, এ পুরো জগৎকে আল্লাহতায়ালা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। নুহ (আ.)-এর জাতি নুহ (আ.)-কে বললেনÑহে নুহ তুমি তোমার প্রভুর একাত্মবাদ বিশ্বাস করানোর জন্য আমাদের সঙ্গে অনেক তর্ক করেছ। এখন তোমার প্রভুর কোনো ক্ষমতা থাকলে আমাদের কিছু ক্ষতি কর। দেখি তোমার প্রভু আমাদের কী ক্ষতি সাধন করতে পারে। (সূরা-হুদ, আয়াত নং-৩২)। নুহ (আ.)-এর জাতি সর্বপ্রথম মুর্তি-পূজা শুরু করেছিল। অতএব মুর্তি-পূজার  সূচনা কীভাবে হয়েছিল তা আমাদের জানা থাকা উচিত, যাতে নুহ (আ.) জাতির মধ্যে যে পথ দিয়ে মুর্তি-পূজা প্রবেশ করেছিল সেই পথ দিয়ে যেন আমাদের মধ্যে মুর্তি-পূজা প্রবেশ করতে না পারে। এ প্রসঙ্গে বুখারি শরিফে আছেÑ নুহ (আ.)-এর যুগে যারা বুজুর্গ লোক ছিল তারা মারা যাওয়ার পর শয়তান তাদের মনে কুমন্ত্রণা দিল যে, তোমরা কি তোমাদের সে বুজুর্গদের ভুলে যাবে। তোমাদের ওপর তাদের অনেক অবদান রয়েছে। তোমরা তাদের স্মরণকে স্থায়ী করার নিমিত্তে তাদের ছবি তৈরি কর। শয়তানের মন্ত্রণা অনুযায়ী তারা তাদের ছবি তৈরি করল। এই প্রজন্ম চলে যাওয়ার পর শয়তান পরবর্তী প্রজন্মকে কুমন্ত্রণা দিল যে, তোমরা তোমাদের বুজুর্গদের এমন একটি নমুনা তৈরি কর যা সহজে নষ্ট হয় না। এতে করে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের বুজুর্গদের একটি ভাস্কর্য তৈরি করল। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে এগুলোর পূজা শুরু হয়ে গেল। শয়তান মানুষের মধ্যে শিরক প্রচার করার জন্য হজরত নুহ (আ.)-এর উম্মতকে ছবি নির্মাণের উপদেশের মাধ্যমে প্রতারিত করেছিল। ধীরে ধীরে তা ভাস্কর্যে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীতে সেই ভাস্কর্যগুলোকে শয়তান তার প্ররোচনার মাধ্যমে উপাস্যে পরিণত করেছিল। শয়তান প্রথমে পাঁচজন বুজুর্গের ছবি নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছিল। ধীরে ধীরে সেই ছবিগুলো উপাস্য আর মাবুদে পরিণত হয়েছে। সেই থেকে পৃথিবীর ইতিহাসে, মানবতার ইতিহাসে মুর্তি-পূজার সূচনা, শিরকের সূচনা হয়। হজরত নুহ (আ.)-এর জাতি বিপথে চলে গেলে নুহ (আ.) তার সম্প্রদায়কে দাওয়াত দিতে থাকলেনÑহে আমার সম্প্রদায় তোমরা মুর্তি-পূজা ছেড়ে আল্লাহতায়ালার উপাসনা কর। (সূরা আরাফ, আয়াত নং-১৪)। নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায় তার দাওয়াতে সাড়া দিল না। বরং নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায় নুহ (আ.)-কে দেখলে মুখে কাপড় দিয়ে মুখ ঢেকে রাখত। এরপরও তিনি তাদের দাওয়াত দেওয়া থেকে বিরত থাকেননি। নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায় তার কথা না শোনার জন্য কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিত। এরপরও তিনি তাদের দাওয়াত দিতেন। সাড়ে নয়শ বছর তিনি এভাবে দাওয়াত দিলেন। কিন্তু তারা দাওয়াতে সাড়া দেননি। এরপর আল্লাহতায়ালা নির্দেশ দিলেনÑ হে নুহ তুমি একটি নৌকা নির্মাণ কর, আমি এক মহাপ্লাবন দিয়ে তাদের ধ্বংস করে দেব। হজরত নুহ (আ.) বিশালাকারের একটি নৌকা নির্মাণ করলেন। তার সম্প্রদায়ের লোকেরা যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন বললÑহে নুহ এত বিশাল নৌকা তুমি কোথায় চালাবে। সমুদ্র তো এখান থেকে বহুদূরে। তুমি কি এ নৌকা রাস্তায় চালাতে চাও? আমরা এতদিন তোমাকে পাগল বলেছি। কিন্তু এর কোনো স্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারিনি। আজ প্রমাণ হয়ে গেল তুমি পাগল। কোরআনে কারিমে স্পষ্ট আছেÑ হজরত নুহ (আ.)-এর সম্প্রদায়কে আল্লাহতায়ালা মহাপ্লাবন দ্বারা ধ্বংস করেছেন। হজরত নুহ (আ.)-কে এ বিশাল নৌকার মাধ্যমে রক্ষা করেছেন। হজরত নুহ  (আ.) রজবের ১ তারিখে জাহাজে উঠেছিলেন। মহররমের ১০ তারিখ ইরাকের ‘জুদি’ পাহাড়ে যখন নৌকাটি আটকে যায় তখন তারা নৌকা থেকে নেমে পড়লেন।


অতএব, রজব মাস আমাদের শিরকের সূচনা, শিরকের বিপর্যয় স্মরণ করিয়ে দেয়। রজব মাসের ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নিয়ে শিরক যেন আমাদের মধ্যে ধীরে ধীরে ঢুকে না পড়ে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts