শহরে ও গ্রামের আয়ের তফাৎ কমিয়ে আনতে হবে

গ্রামের আয় বেশ কম আমাদের দেশে। গড় পারিবারিক আয় শহরের তুলনায় মোটামুটি পাঁচ ভাগের তিন ভাগ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রামে গড় পারিবারিক আয় শহরের তুলনায় নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি অর্ধেকেরও কম ছিল। এ ব্যবধান কিছুটা সংকুচিত হয়ে ২০০০ সালে অর্ধেকের কাছাকাছি এবং ২০০৫ সালে অর্ধেকের উপরে এসে ২০১০ সালে মোটামুটি একই থাকে। গ্রামে পারিবারিক আয় শহরে পারিবারিক আয়ের ৫৯ শতাংশের সমান। গ্রামে পারিবারিক আয়ের বড় উৎস হলো কৃষি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি গ্রামে কৃষি আয় মোট পারিবারিক আয়ের ৩৫ শতাংশের ওপর থেকে কমে, ২০১০ সালে ৩০ শতাংশের নিচে চলে আসে। অন্যদিকে পেশাদারি মজুরি ও বেতন বাবদ পারিবারিক আয় মোট আয়ের প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, ব্যবসা ও বাণিজ্য বাবদ আয় ১৪ শতাংশের নিচে থেকে ১৫ শতাংশের ওপর এবং প্রাপ্তি ও রেমিট্যান্স বাবদ আয় প্রায় ১০ থেকে ১৭ শতাংশের ওপরে বৃদ্ধি পায়।

গ্রামে খাদ্য, পানীয়, পোশাক, জুতা-মোজা, জ্বালানি, বাতি, পারিবারিক দ্রব্যাদি ও চিকিৎসা বাবদ শহরের তুলনায় বেশি ব্যয় হয়। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে গ্রামের লোকেরা শহরবাসীদের তুলনায় বেশি খরচ করে। পণ্যমূল্যের সঙ্গে পরিবহন খরচ সংযোজিত হওয়ায় এই অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হয়। উল্লেখ্য, গ্রামে ঢেঁকি, জাঁতাকল, গাইন ইত্যাদি উঠে যাওয়ায় শহর থেকে এখন চাল-ডাল ও তেলও আমদানি করতে হয়। পারিবারিক খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় অতিরিক্ত শ্রম বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। তার পরও প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হয় না। আয় ও দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ উভয় ক্ষেত্রে শহরের সঙ্গে বৈষম্য থেকে যায়। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় ফসলের মূল্য বাড়েনি। প্রধান ফসল ধানের মূল্য এ দশকের মাঝামাঝি পড়ে যায়। কৃষিপণ্য শহরে যে দামে বিক্রয় হয়, তার থেকে বেশ কম দরে গ্রামের কৃষকদের থেকে ক্রয় করা হয়। এমন অবস্থায় লাভজনক না হলে ফসল আবাদে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। জমির মালিকরা মজুরি বাড়াতে চাইবেন না। বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে এ দশকের মাঝামাঝি থেকে পতিত বা অনাবাদি জমি বৃদ্ধির লক্ষণ দেখা যায়।

কৃষি আধুনিকায়নের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে ফসলের মূল্য ও মজুরি হার উভয়ই বৃদ্ধি পেতে থাকে। কৃষি পরিবারগুলোর আয় বৃদ্ধি গ্রামে আর্থসামাজিকতায় সঙ্গতিপূর্ণ হতে উদ্যোগ গ্রহণের পথ প্রশস্ত করে। পরিবারের সদস্যদের বিনিয়োগে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়।  প্রতিবেশীদের দেখে, প্রয়োজনে বা অভিজ্ঞতা থেকে ব্যবসায়ে উদ্যোগ নেয়ার মনোভাব বাড়ে। এ পরিবর্তনে বাংলাদেশে আধুনিক কৃষি ও অকৃষি কর্মকাণ্ড উভয়ের সমন্বয়ে এক ‘নতুন গ্রাম’ গঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া জোরদার হয়। কৃষি কর্মকাণ্ড পণ্যভিত্তিক ও কৃষি বিপণনসংশ্লিষ্ট হতে থাকে। গৃহায়ণ ও কলকারখানাভিত্তিক সেবার সঙ্গে জড়িত ও বাজারচালিত অকৃষি কর্মকাণ্ড প্রসার পেতে থাকে। গ্রামের শ্রমজীবীরা চায়ের দোকানে ও টিভি দেখে অবসর সময় কাটানো বা বিনোদনের সুযোগ পায়। এ দেশে ফল উৎপাদনের চারা তৈরি, রোপণ, বাগান পরিচর্যা, সংগ্রহ ও প্যাাকেটিং;  মৎস্য খামারে পোনা উৎপাদন, প্রজনন, পরিচর্যা ও সংগ্রহ এবং গাভীর খামারে পরিচর্যা, দুধ সংগ্রহ ও সংরক্ষণে কৃষি ও অকৃষি শ্রমের চাহিদা সৃষ্টি হয়। এভাবে গ্রামের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। কৃষি পরিবারে শ্রম বিভক্তি ঘটে। পরিবারের কোনো সদস্য কৃষিকাজ ও অন্য সদস্য অকৃষি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হয়। আবার একই সদস্য কৃষি উৎপাদনের পর অবশিষ্ট সময় অকৃষি কাজে ব্যয় করতে শুরু করে। এই নতুন ধারায় খণ্ডকালীন কৃষিকাজ, সঞ্চয় ও পুঁজি বিনিয়োগ এবং অকৃষি গ্রামীণ পেশাজীবীদের সুযোগ তৈরি হয়।

যথাযথ প্রযুক্তি প্রয়োগ ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য হারে আয় বৃদ্ধির জন্য গ্রামের কৃষক ও শ্রমজীবীরা যথেষ্ট দক্ষ বা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে পারেননি। কৃষি উৎপাদন ও ফসলের ফলন বৃদ্ধির নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকলেও উৎপাদিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত সম্পর্কে ধারণার অভাব রয়েছে। কৃষি আয় যথেষ্ট না হওয়ায় কোনো কোনো পরিবার অকৃষি উপার্জনে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। কৃষির ওপর নির্ভরতা কমে গেছে। কৃষি ও অকৃষি আয়ের পরও অভাব থেকে গেছে। চাহিদার তুলনায় সম্মিলিত আয় পর্যাপ্ত হয়নি। গ্রামে এখন প্রয়োজন কৃষক, খামার মালিক এবং কৃষি ও অকৃষি শ্রমজীবীদের উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ, কৃষি উপকরণ ও পণ্যমূল্য যাচাই, বাজার চাহিদা পর্যালোচনা, পণ্যের গুণগত মান উন্নয়ন ও বাজারজাত, কৃষি ও অকৃষি কাজে শ্রমজীবীদের দক্ষতা সৃষ্টির জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি; সেই সঙ্গে কারিগরি সহায়তাসহ নানামুখী কৃষি উৎপাদনশীল খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ জুগিয়ে গ্রামে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। এ ব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সঠিক ও লাভজনক বিনিয়োগে খাত চিহ্নিত করতে এগিয়ে এসে জোরদার ভূমিকা নিতে পারে। এ দেশে মোট ফসল আবাদি এলাকার তিন-চতুর্থাংশে ধান উৎপাদন হয়। ফলে ধান উৎপাদনে কৃষকরা যথেষ্ট দক্ষ হলেও অন্যান্য ফসল আবাদ, গবাদিপশু পালন ও মৎস্য চাষে পিছিয়ে। বিভিন্ন দেশে কৃষি ক্রমেই এগ্রো-ফুড চেইন এবং বিশ্ববাজারের সঙ্গে অধিকতর অঙ্গীভূত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে পড়েছে। সাধারণ ভোক্তারা খাদ্যের গুণাগুণ বিচার করছে। এমনকি নিরাপদ কিনা যাচাই করে দেখছে। বর্ধিত চাহিদা পূরণে উচ্চমানের কৃষিপণ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সব মিলে কৃষকরা এখন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন ও যথাযথ প্রযুক্তি বাছাই করার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন জরুরি হয়ে পড়েছে।  

অর্থনৈতিক সিঁড়ির উপরে ওঠার অন্যতম উপায় হলো শিক্ষা অর্জন। শহর ও গ্রামের মধ্যে আয়বৈষম্য দূর করতে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার ভূমিকা কতটা সহায়ক, তা পর্যালোচনা করে দেখা যেতে পারে। শিক্ষার জন্য পারিবারিক ব্যয় সামর্থ্য শহরের তুলনায় গ্রামে অনেক কম।

চীনে শহর ও গ্রামের মধ্যে আয়বৈষম্য কমছে। বিগত দশকে পারিবারিক আয় গ্রামের তুলনায় শহরে তিন গুণের ওপর থেকে নিচে চলে এসেছে। চলতি দশকের শুরু থেকে গ্রামে বার্ষিক আয় বৃদ্ধির হার শহরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৫ সালে ৮ শতাংশের কাছাকাছি চলে আসে। ওই বছর শহরে বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নিচে থাকে। গ্রামের শ্রমজীবীদের অনেকেই নগরাঞ্চলে কাজ করলেও চীনের নিয়ন্ত্রিত আবাসিক ব্যবস্থা তাদের শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস থেকে বিরত রাখে। এছাড়া শিল্প, ফ্যাক্টরি ও কলকারখানায় প্রত্যন্ত গ্রামের শ্রমজীবীদের নিয়োগে প্রাধান্য দেয়া হয়। এতে বেতন বা মজুরি হার কিছুটা কম হওয়ায় নিয়োগকারীরাও লাভবান হন।  গ্রামে ছেলেমেয়েরা স্কুলে প্রথম নয় বছর বিনা বেতনে লেখাপড়ার সুযোগ পায়। শতাব্দীকাল পুরনো কৃষিকর বা খাজনা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে এনে গত দশকের মাঝামাঝি রহিত করা হয়েছে। এতে কৃষকরা অধিকতর বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছেন। অকৃষি কাজ করে উপার্জন বৃদ্ধির প্রয়োজন কমে যাওয়ায় নিজস্ব কৃষি উৎপাদনে বেশি করে শ্রম নিয়োগের সুযোগ হয়েছে। ইউএনডিপির এক প্রতিবেদনে চীনে গ্রামীণ আয় বৃদ্ধিতে মূল্যসংস্কার উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।  সংস্কারের প্রাথমিক ধাপে সরকার প্রধান ফসলগুলোর সংগ্রহ মূল্য এবং মাংস ও ডিমের খুচরা মূল্য বেশ বৃদ্ধি করে। এতে সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে গ্রামে মাথাপিছু আয় এক-চতুর্থাংশ বৃদ্ধি পায়। এ পদক্ষেপ নেয়ায় এসব কৃষিপণ্যের উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।

আমাদের দেশে প্রায় সোয়া তিন কোটি পরিবারের ৮০ শতাংশের বসবাস গ্রামে। এ গ্রামেই প্রায় ১৩ কোটি মানুষের ঠিকানা। গ্রামে বসবাসকারী অর্ধেকের বেশি মানুষের বয়স ২৫ বছরের কম। আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ গঠন ও নাগরিক জীবনযাপনে বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মত্স্য ও বন গবেষণা, সম্প্রসারণ এবং পল্লী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এখন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ পর্যন্ত গ্রামের আয় বৃদ্ধিতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts