সায়েন্সফিকশন- ভালোবাসার জন্য

অমিত রিয়ার সামনে এসে ওর হাত দুটো ধরল। রিয়া শুনতে পাচ্ছে তার হৃদস্পন্দন আনুপাতিক হারে বাড়ছে। ব্রেনের ভিতর নিউরনের ছুটাছুটি দ্বিগুণ হয়েছে। অমিত যখন রিয়ার দিকে তার মুখটা বাড়ালো রিয়ার মনে হল অমিতের নিঃশ্বাস ঘূর্ণিঝড়ের মতো ওর সমস্ত কিছু উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। রিয়া মনে মনে ভাবছে অমিত কেন এখনো তাকে জড়িয়ে ধরছে না? অমিত যখন সত্যিই রিয়াকে জড়িয়ে ধরল রিয়ার তখন মনে হলো ২০০ বছর আগে পৃথিবী থেকে ছেড়ে আশা এই মহাকাশযানটাতে তার থেকে সুখী মনে হয় আর কেউ নেই। 

মেকানিক্যালি সিলড ডোরের মেকানিক্যাল শব্দে রিয়ার মোহভঙ্গ হলো। রিয়া সরকারি অনুমতি ব্যতিরেকেই সন্তান ধারণ করেছিল। বিগত ৫০ বছর ধরে মহাকাশযানটির জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধে সরকারি অনুমতি ব্যতীত সন্তান ধারনটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে আইন করা হয়। রিয়া এবং অমিত সেই আইন অমান্য করেছে। শুধু তাই নয় অমিত যখন জানতে পারে পার্সোনাল মনিটরিং সিস্টেম এর মাধ্যমে সেই খবর সরকারের কাছে চলে গিয়েছে তখন অমিত তাদের দুজনের পার্সোনাল মনিটরিং সিস্টেম এর মেমোরি খালি করে দেয় যাতে তাদেরকে আর মনিটরিং করা না যায়। 

অমিত একজন সাইনটিস্ট সে জানে যে কোন ডিভাইসে প্রোগ্রামিং গুলো মেমোরিতে সেভ করা থাকে যা মূলত একটি ম্যাগনেটিক ডিভাইস। আর কোন উচ্চশক্তিসম্পন্ন ম্যাগনেট এর পাশে যে কোন মেমোরি ডিভাইস নিয়ে গেলে সে মেমোরীটা ফাঁকা হয়ে যায়। রিয়ার দুর্ভাগ্য, শপিংমলে থাকা বায়োমেট্রিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম এ রিয়া ধরা পড়ে যায়। 

রোবটিক অ্যাবরশন এর মাধ্যমে রিয়ার এই সন্তানটি নষ্ট করে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। পার্সোনাল মনিটরিং সিস্টেম নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর ডিএনএ আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দেরি হচ্ছে। রোবটিক অ্যাবরশন মূলত মাইক্রোস্কোপিক কিছু রোবটকে গর্ভবতীদের শরীরে ইঞ্জেক্ট করে দেওয়া হয়। এই মাইক্রোস্কোপিক রোবট গুলো গর্ভবতী মায়ের গর্ভথলিতে গিয়ে বাচ্চার সেল গুলোকে নষ্ট করে আস্তে আস্তে মূত্রনালী দিয়ে বের করে দেয়। রিয়া চায় না তার সাথে এমন হোক এবং সে বিশ্বাস করে অমিত তাকে সাহায্য করার জন্য অবশ্যই আসবে।

মহাকাশে নিয়ন্ত্রণ আর মানুষের হাতে নেই। দুটি সুপার কম্পিউটার মহাকাশযানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। এই সুপার কম্পিউটার চায় না মানব সভ্যতা আর সামনের দিকে অগ্রসর হোক। আর তাই পৃথিবীকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে সারা পৃথিবীর মানুষকে একটি মহাকাশযানে বন্দি করে রেখেছে। সাধারণ মানুষ মনে করে মহাকাশযানটি নিয়ন্ত্রণ করছে মহাকাশযানটির ক্যাপ্টেন রবার্ট। কিন্তু আসল ঘটনা আসলে কেউ জানে না।

রিয়াকে আটকে ফেলার পর থেকেই অমিতের চোখে ঘুম নেই। কিভাবে  তাকে বের করে আনা যায় তারই চেষ্টা চালাচ্ছে। অনেক ঘাটাঘাটি করে অমিত দেখলো সিকিউরিটি সিস্টেমে যে নতুন রোবট গুলো এসেছে তাতে যে অপারেটিং সিস্টেম দেওয়া সেগুলোতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন অনলাইন সিকিউরিটি রয়েছে যা বর্তমানে ব্যবহৃত কম্পিউটার দিয়ে হ্যাক করা সম্ভব নয়।  কিন্তু সেগুলোকে একুশ শতকে ব্যবহৃত কম্পিউটার দিয়ে খুব সহজেই হ্যাক  করা যায় আর তা মেইন মনিটরিং সিস্টেমএ ধরাও পড়ে না। গবেষণার কাজে মিউজিয়াম থেকে আনা কোর আই ৭ ভার্সনের কম্পিউটারকে কাজে লাগিয়ে সে একটি কার্গো স্পেসক্রাফট এর মেইন মনিটরিং সিস্টেমকে ধোকা দিয়ে হ্যাক করে তাতে গিয়ে উঠল এরপর তার প্লান অনুসারে অগ্রসর হল। 

রিয়াকে আজই অ্যাবরশন করানো হবে। ইতিমধ্যে তার ডিএনএ স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে। সে মনে মনে শুধু অমিতের কথা ভাবছে। তাদের এই সন্তানকে কি সে রক্ষা করতে পারবে না? একটি রোবট এসে রিয়াকে বলল আপনি আমাকে অনুসরণ করুন। রিয়া কোন কিছু না ভেবেই তাকে অনুসরণ করা শুরু করল। যখন প্রধান দরজা দিয়ে বেরোবে তখনি সিকিউরিটি এলার্ম বেজে উঠল। রোবটটি উল্টো ঘুরে রিয়াকে বলল 'বাইরে এসপিসি-৩ স্পেসক্রাফট আপনার জন্য  অপেক্ষা করছে। প্রধান দরজা এখনি বন্ধ হয়ে যাবে আপনি দৌড়ে বেরিয়ে যান।' রিয়া দেখলো ততক্ষণে দরজা বন্ধ হওয়া শুরু হয়েছে।  রিয়া দৌড় দিল। দরজা একেবারে বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তে রিয়া লাফিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাইরেই একটি স্পেসক্র্যাফট দাড়িয়ে থাকতে দেখে সেই দিকেই দৌড়তে থাকলো। রিয়া দেখে অবাক হলো অনেকগুলো রোবট বাইরে দাড়িয়ে কিন্তু কেউই তাকে কিছু বলছে না বা ধরার চেষ্টা করছে না। সে স্পেসক্রাফট এ ওঠার সাথে সাথে দরজা আটকে স্পেসক্রাফটটি হাইপারসনিক গতিতে পালিয়ে গেল। স্পেসক্রাফটের ভিতর একটি রোবট রিয়াকে একটি রুমে নিয়ে গেল। রুমে ঢোকার পর পেছন থেকে অমিত তাকে জরিয়ে ধরলো। অমিতকে দেখে রিয়া আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলো না। অমিতকে সামনে থেকে জরিয়ে ধরে বলল,

- তুমি আমাদের সন্তানকে বাঁচাতে পেরেছো।

- হ্যাঁ আমরা দুজন মিলেই পেরেছি। 

- আমি তো ভেবেছিলাম আমাদের সন্তান আর আলোর মুখ দেখবে না।

- আমাদের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখবে।

- পৃথিবীর আলো?

- হ্যাঁ আমরা পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছি। আবার নতুন করে পৃথিবীকে সাজাবো। আমাদের সন্তানের জন্য একটা নতুন পৃথিবী উপহার দেব।

    Tags :

No Comment yet. Be the first :)

Related Posts