হুজুর যখন ক্রাশ (পর্ব ৬)

প্লাস্টার খোলার সময় রামিসা তার পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। আহা! কি সুন্দর পায়ের কি দশা হলো। এক মাসের বেশি সময় ধরে প্লাস্টার বেঁধে রাখার কারণে জায়গাটা কেমন ফ্যাকাসে সুন্দর দেখাচ্ছে। 

" দেখি! ইয়াং লেডি। ট্রাই টু মুভ ইওর লেগ নাও।"

ডাক্তার সাহেব হেসে হেসে বললেন।

" ব্যাথা লাগে?"

" নাহ। তেমন না।"

হাসি হাসি মুখে রামিসা উত্তর দিলো।

" হাটার চেষ্টা করো দেখি, আস্তে আস্তে উঠো। "

ক্রাচে ভর দিয়েই রামিসা উঠে দাঁড়ালো।

" ভাইয়া আমি দাঁড়াতে পেরেছি। দেখ্! মা আমি আবার হাঁটতে পারছি। কি ভালো লাগছে আমার।"

চোখে মুখে বেশ উচ্ছ্বাস রামিসার।

" অটিস্টিক এর মত হাসছিস কেন? আগেই তো বলেছিলাম ঠিক হয়ে যাবি। যে মুটকি হয়ে গেছিস একমাস শুয়ে থাকতে থাকতে। প্রতিদিন এক বেলা খাবি আর দুই বেলা দৌড়াবি। তারপর তোকে মানুষের মত লাগবে। হা হা হা।"

আহসানের কথা শুনে আজ আর রাগ হলো না রামিসার। ভাইয়ের সাথে তাল মিলিয়ে সেও হাসতে লাগলো। সবার হাসিতে মনে হল কেবিনে এতদিন পরে কোন উৎসব লেগেছে........


রাতের রামিসা আবার চিঠি পড়তে শুরু করলো।


"......... আমার মা ছিলেন খুব পরহেজগার একজন মানুষ। ছোটবেলায় মা যখন তাহাজ্জুদ পড়তেন আমরা ঘুমের ভেতর শুনতাম মা কারো সাথে কথা বলতেন। বেশ বড় হবার পর একবার মাকে বলতে শুনেছিলাম আমাদের বাড়ির যে ঘরে তাহাজ্জুদ পড়তেন সেই ঘরের জানালার নেটের খুব ছোট ছোট ফোকর থেকে এক জ্বীন জিকির করতেন। এর বেশি কিছু মা বলতে চাইতেন না। তাই আমরাও আর কখনো কিছু শুনিনি। বাবার ঘটনাটি মা কিভাবে যেনো জেনে গিয়েছিলেন। প্রায়ই দেখতাম উনি যখন তখন জায়নামাজে বসে শুধু কাঁদছেন। আমি বলতাম, মা এখন তো কোন নামাজের সময় না, আপনি কিসের নামাজ পড়তে যাচ্ছেন? উনি কোন উত্তর দিতেন না। শুধু কাঁদতেন। আমার তখন চার কি পাঁচ বছর বয়স। একদিন হঠাৎ মা আমাদের কাউকে কিছু না বলেই কোথায় যেন চলে গেলেন। আমার বড় ভাই তখন হাই স্কুলে পড়েন। আমাকে কোন এক দূর সম্পর্কের চাচির বাসায় রেখে উনিও কোথায় যেন চলে গেলেন। ঠিক এক সপ্তাহ পরে আমার ভাই ফিরে এলেন। বললেন বাবা খুব অসুস্থ। তাই মা বাবার সাথে চট্টগ্রামে এক হসপিটালে আছেন। সুস্থ হলে ফিরে আসবেন। কিন্তু এক মাস হয়ে গেলো। আমার মা এলেন না। এদিকে আমিও কান্নাকাটি শুরু করি মাকে দেখার জন্য। এর কিছুদিন পরে আমাদের কাছে একটা সংবাদ এলো। আমার ভাই আমাকে নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন। বাবাকে দেখতে গেলাম। গিয়ে যা দেখলাম তা ওইটুকুন বয়সে দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম। দেখি বাবা নিথর দেহ পড়ে আছে হাসপাতালের করিডোরে। মা অপলক চোখে বাবার লাশের দিকে তাকিয়ে শুধু কি যেন পরে যাচ্ছেন। আমি বাবাকে দেখেই কাঁদতে লাগলাম..........."

হঠাৎ রামিসার বেড জোরে একটা ঝাকুনি খেলো।

"কে?"

পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইলের লাইট দিয়ে চুরি করে রামিসা চিঠি পড়ছে। মা ঘুমিয়ে পড়ার পর চিঠি পড়ার জন্য এই পদ্ধতি তার কাছে ঝামেলাহীন মনে হয়েছে। কিন্তু এত জোরে খাট নাড়া দিল কে! খানিক ভয় পেলো রামিসা। কোরআন শরীফ কি তার মাথার পাশে নেই? হাত দিয়ে দেখতেই বুকের ভেতরটা কেমন শুকিয়ে গেল। আসলেই নেই। কে নিলো ?

" মা.... মা..."

চিৎকার করতেই রামিসার মা জেগে উঠলেন।

" কিরে এত রাতে, এমন চিৎকার চেঁচামেচি করছিস কেন? ঘুমাসনি?"

" মা আমার কোরআন শরীফ কই? মাথার পাশে নেই। "

"এত রাতে কোরআন শরীফ দিয়ে কি করবি তুই?"

" মা আমার মাথার কাছে নেই। কে নিলো? " বলেই কাঁদতে লাগল রামিসা।

" আরে বোকা মেয়ে কাল আমরা বাসায় যাচ্ছি। আমি সব গুছিয়ে প্যাকেট করে আহসানের কাছে দিয়ে দিয়েছি। কাঁদছিস কেন পাগল মেয়ে একটা!"

"কী? বাসায় দিয়ে দিয়েছো?কেন এমন করলে মা? এখন সে আবার আমার কাছে আসবে" বলে আবার কাঁদতে লাগলো রামিসা।

" তোর কি মাথা গেছে নাকি রে? কি সব পাগলের মত বলছিস! কে আসবে? তুই এত ভয় পাচ্ছিস কেন বলতো? আমি আছি না!"

" তুমি কিচ্ছু করতে পারবে না মা। সে আমাকে মেরে ফেলবে।"

" মেরে ফেলবে মানে? কে সে? কার এত বড় সাহস আমার মেয়েকে মারতে আসে? নাম কি তার?”

রামিসা শুধু জানালার বাহিরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে বললো.......

" সাদিয়া। তার নাম সাদিয়া, মা....।''



(চলবে)

    Tags :

Related Posts